খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

অবেলায় বৃষ্টি


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

রাস্তার পাশ ঘেঁষে দ্রুত পায়ে হাঁটছে রুহি। দু’হাত ভর্তি এক গাদা বাজার। হাত দু’টোর অবস্থা পুরো খারাপ হয়ে গেছে। দু’ব্যাগ ভর্তি বাজার টানা তো আর চারটিখানি কথা না। আর সেটা যদি কোনো মেয়ে মানুষ হয় তাহলে তো আর কথাই নেই।

আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে মেঘের ভয়ংকর গর্জন। বেশ জোড়ালো বাতাসও বইছে। শাড়ির আঁচলটা বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উড়ছে এদিক-সেদিক। বড্ড অবাদ্ধ হয়ে গেছে আজ নিজের শাড়ির আঁচলটা। কোনভাবেই নিজের আয়ত্তে রাখতে পারছে না রুহি। অগত্যা আঁচলটাকে নিজের মতো উড়তে দিয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই চারদিকে সন্ধ্যার ন্যায় আধার ঘনিয়ে এল পুরো পৃথিবী জুড়ে। মনে হচ্ছে এখনি বুঝি ঝুম বৃষ্টি নামবে।

আজকাল রিক্সাওয়ালারাও যেন হাতির পাঁচ পা দেখেছে। আকাশে একটু মেঘ করলো কী করলো না, ওমনি রিক্সাওয়ালাদের ভাব বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। দশ টাকার ভাড়া চেয়ে বসে ত্রিশ টাকা। তাই আর রিক্সা দিয়ে আসার প্রয়োজন মনে করলো না রুহি। মনে মনে কয়েক দফা কথা শুনিয়ে দিলো রিক্সাওয়ালাদের। রিক্সাওয়ালাদের কানে কথাগুলো পৌঁছাক বা না পৌঁছাক তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সে যে মনে মনে হলেও কথাগুলো বলতে পেরেছে এতেই তার শান্তি। বড্ড আজব এই শান্তির ব্যাপারটা! কখন যে কীভাবে শান্তি ব্যাপারটা চলে আসে বলা বাহুল্য।

দ্রুত পা চালাতে লাগলো রুহি।  কয়েক পা সামনে এগুতেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো।  বাতাসের প্রকোপও কিছুটা কমেছে। তবে পানির ফোঁটাগুলো একটু বেশিই বড় মনে হচ্ছে  যার কারণে শাড়ির প্রায় অনেকখানি ভিজে গেছে। রুহি চারদিকে একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটা বন্ধ দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বাজারের ব্যাগগুলো পাশে রেখে শাড়ির আঁচল টেনে মাথাটা মুছতে লাগলো৷ শাড়ির নিচটায় অনেকখানি কাদা লেগে গেছে। পায়ের স্যান্ডেলগুলো কাদার কারণে পিছলে হয়ে গেছে। সহসাই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানের সামনের পাতানো টুলটার ওপর পা ঝুলিয়ে বসলো। না চাইতেও এমনই একটা বৃষ্টির মুহূর্ত মনে পরে গেল রুহির। সেদিন ছিল রুহির জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা মুহূর্ত । পুরো বাড়ি জুড়ে লাল-নীল রঙের লাইটে সেজেছিল, সাউন্ড বক্সে উচ্চ মিউজিক বাজছিল,পুরো বাড়িতে মেহমান গিজগিজ করছিল। বৃষ্টির পরিমাণ সেদিন আজকের মতো এত প্রকোপ আকার ধারণ করেনি। শুধু গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝড়ছিল নির্মল সাদা ধবধবে আকাশটার বুক চিড়ে। বৃষ্টি রুহির পছন্দের তালিকার শীর্ষ স্থানে জায়গা করে নিয়েছিল বয়স যখন ছ’ কী সাত। বড্ড বেশিই ভালো লাগে তার বৃষ্টির দিনগুলি। নিজের বিয়ের দিন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেদিনও মনে মনে আনন্দের জোয়ার বইছিল পুরো হৃদয় জুড়ে। মনে মনে কয়েক দফা জল্পনা -কল্পনা সাজিয়ে নিয়েছিল বাসর রাত নামক রাতটায় এমন একটা বৃষ্টির রাতে কী করে কাটাবে তার প্রিয় মানুষটার সাথে। বারবার নিজের মনে ভাবছিল আর সবার চোখের আড়ালে ঘোমটার নিচে হাসছিল মেয়েটা। সেদিন রুহি সবচেয়ে বেশি  খুশি ছিল কারণ তার প্রিয় মানুষটার সাথে চিরজীবনের জন্য দু’জন ভালোবাসার মানুষ বাঁধা পড়তে যাচ্ছিলো। আর ভাবতে পারছে না রুহি। চোখ জোড়া মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে উঠলো। না কাঁদবে না সে। কেন কাঁদবে? অতীতের কথা ভেবে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না। বৃষ্টিও কমে এসেছে। শাড়ির আঁচল টেনে ঝাপসা চোখজোড়া মুছে নিলো অবেলায়। সবার কথা ভেবে কাঁদতে নেই।  অন্তত যে সমুদ্রের মাঝ পথে ফেলে রেখে চলে যায় অন্তত তার জন্য তো নয়ই।

বৃষ্টির ধারা কমে আসতেই বাজারগুলো হাতে নিয়ে আবারও এগুতে লাগলো রুহি। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে তখনও। মাথার ঘোমটাটা উড়িয়ে নিয়ে ফেলে দিলো কাঁধের কার্নিশে। ভাগ্যিস বাড়ি থেকে বেড়ুবার আগে সেফটিফিন দিয়ে আটকে নিয়েছে নয়তো কী কেলেঙ্কারিটাই না হতো। ভেবেই একটা সুস্থির নিশ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে এগুতে লাগলো সামনের দিকে। সহসাই পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর কানে বাজলো,
“এই যে আপু আপনার আঁচলটা কাঁদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। একটু উঠিয়ে হাঁটুন।”

পথের মাঝখানে থমকে দাঁড়িয়ে পরলো রুহি। পেছনে তাকানো কী ঠিক হবে? মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেও পেছনে ফেরলো রুহি। একজোড়া কপোত-কপোতী এক ছাতার নিচে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলছে। ছেলেটা একটা হাত বাড়িয়ে মেয়েটার কাঁধ জড়িয়ে রেখেছে। এই হাঁটা, এই কণ্ঠস্বর, সবই তো বড্ড চেনা তার। কিন্তু কোথাও যেন খুব বেশিই আজ আফসোস হচ্ছে। তীক্ষ্ণভাবে বুকের কোথাও যেন দু’টুকরো হয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে প্রবলবেগে। কী করে পারলো না একটু চিনতে? আজ তো ওই ছাতার নিচে ওর নিজের থাকার কথা ছিল! এক সময় তো এই রুহিই কত কাছের ছিল! আর আজ সে হয়ে গেল কোন এক পথচারী আপু! সত্যিই বড্ড অদ্ভুত এই পৃথিবীটা। তার থেকেও অদ্ভুত পৃথিবীতে বসবাসকারী একেকটা মানুষ। কত সহজেই সম্পর্কের মানেগুলোকে কোথায় থেকে কোথায় এনে দাঁড় করায়। যতদূর সুন্দর একজোড়া দম্পতিকে দেখা গেল ততক্ষণ পর্যন্ত চাতক পাখিরে মতো তাকিয়ে রইলো রুহি। এতক্ষণ বাহিরে আকাশের বুক চিড়ে ঝুম বৃষ্টি নামছিল। সেই ঝুম বৃষ্টি এখন পালাবদল করে রুহির চোখ থেকে শুরু হয়েছে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললো নিজ গন্তব্যে।
বাড়িতে পৌঁছে চার বছরের ঘুমন্ত পরীকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে অঘোরে কাঁদতে লাগলো। বাচ্চা মেয়েটা ঘুম ভেঙে অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মায়ের এত কান্নার কারণ মনে মনে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে। অগত্যা কোন কারন খুঁজে পেল না সে।  তারপর প্রশ্ন করে বসলো,
“মা কাঁদছো কেন তুমি?”
মেয়ের প্রশ্নে চুপ হয়ে গেল রুহি। সত্যিই তো সে কেন কাঁদছে? এক দৌড়ে চলে গেল ব্যলকুনিতে। বছর পাঁচেক আগে সবার চোখের আড়ালে দু’জন মানুষ বিয়ে করেছিল যার ভালোবাসার ফলস্বরূপ এই ছোট্ট পরীটা(ত্বোহা)। সবার মতে বিয়ে হওয়ার দিনই সবটা এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেছিলো রাসেদ(যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল)। নিজের সন্তানকে পর্যন্ত অবৈধ বলে ছিল রাসেদ। এই অবৈধ সন্তানের দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। তাই সেদিন মাঝ সমুদ্রে রুহিকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল রাসেদ। তখন রুহি মাত্র চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কী করবে না করবে, ভেবে না পেয়ে কয়েকবার আত্মহত্যাও করতে গিয়েছিল মেয়েটা। শেষমেশ রুহির মায়ের সর্বসময়ের সাপোর্টে আজও সে ঠিকভাবে চলতে পারছে । কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই কাঁধে কারও শীতল স্পর্শ পেতেই কান্নাভেজা চোখে পেছন তাকালো রুহি। মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো,
“মা! মাগো! আমি হেরে গেছি। জীবন যুদ্ধে আমি হারতে হারতে বড্ড ক্লান্ত মাগো।”
রুহির মা আলতো করে মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে অভয় দিয়ে বলতে লাগলেন,
“তুই হারিসনি। তোর তো জয় হয়েছে। ত্বোহার মতো যার এত সুন্দর একটা পরী আছে সে কখনো হারতে পারে না।”
মায়ের কথাগুলো শুনে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণে। সত্যিই মা নামক এই মানুষটা আছে বলেই হয়তো রুহি আর তার ত্বোহা এখনও ভালো আছে। সুন্দরভাবে বাঁচার কথা চিন্তা করতে পারছে। নয়তো হারিয়ে যেত কোন অবেলায়….!


লেখা_খাইরুন নেছা রিপা

সমাপ্ত

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777