খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

অব্যক্ত_কথা

অব্যক্ত_কথা

লেখাঃ খাইরুন নেছা রিপা

একটা সকাল মানেই নতুন দিনের আহ্বান। একটা সকাল মানেই নতুন জীবনের আগমন।একটা সকাল মানেই পূর্নতা। একটা সকাল মানেই কখনো কখনো একবুক শূন্যতা।সবটাই সময়ের আবর্তনে বোঝা যায়। হয়তো অনকটা সময় হারিয়ে, বোঝা যায় সময়ের মানে!

মিষ্টিময় একটা সকালে ব্যালকনিতে রকিং চেয়ারে বসে আছে সজীব। যার কাছে একটা সকাল মানেই আমোদ-ফূর্তি। যার দিনের শুরুটা হয় ভিন্ন ভিন্ন সুশ্রী রমণীর হাতের কোমল পরশে। আজ এক সুন্দর রমণী তো কাল অন্য। কিন্তু এর মধ্যেও একজন বিশেষ কেউ আছে। এত কিছুর মাঝেও কখনোই ভাবতে পারেনি একটা মিষ্টি সকাল তার জীবনকে বিষাদময়তার হাতছানি দিয়ে ডাকবে।জীবন মানেই গল্প! গল্প মানেই জীবনের খণ্ডাংশ! কিন্তু নিজের জীবনেরও যে এমন কোন গল্প হবে জানা ছিলো না সজীবের!

খানিকটা সময় রকিং চেয়ারে বসে থাকার পর হাতে থাকা নিকোটিনে গাঢ়ভাবে টান দিলো সজীব। সঙ্গে সঙ্গেই কাশি উঠে গিয়ে নাকের তালু,গলা জ্বলতে লাগলো প্রগাড়ভাবে। খুব একটা নিকোটিনের প্রতি নেশা নেই তার। তার নেশা মানেই সুন্দরী রমণী। নিকোটিনের ধোঁয়ায় বুকের জ্বালা কমাতে চেষ্টা  করলেও ভেতরের জ্বালাটা যেন দ্বিগুণ গতিতে বাড়তে লাগলো। নিকোটিনের ধোঁয়া কোনভাবেই ভেতরের জ্বলাটা কমাতে পারলো না। বরং কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো। খুব শূন্যতা বিরাজ করছে ভেতরের ছোট্ট মনটায়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সজীব। পা ফেলে এগুলো নিজের রুমের দিকে। এখনই তৈরী হয়ে  সাবেরার কাছে যেতে হবে।তবেই সব জ্বালার অবসান ঘটবে। এর এত রমণীর মাঝে কেবলমাত্র সাবেরাই বিশেষ কেউ! আজকাল বিভিন্ন সুশ্রী রমনীরাও সজীবের নেশা ধরাতে পারেনা। তবে সাবেরা নামের কেউ একজন খুব সহজেই সজীবের নেশা ধরিয়ে দিতে পারে। অন্যরকম এক ক্ষমতা আছে মেয়েটার যা সবসময় সজীবকে খুব টানে । তাড়াহুড়ো করে আলমারি থেকে স্যুট বের করতে গিয়ে বাঁধলো আরেক বিপত্তি। একটা ডায়েরি ধপাস করে পায়ের সামনে পরলো। অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু ঝুঁকে ডায়েরিটা তুলে নিলো সজীব। ডায়েরিটা আলমারিতে রাখতে গিয়েও, আনমনে ডায়েরির একটা পাতা উল্টালো। সহসাই ডায়েরির পাতায় চোখ আটকে গেল সজীবের।

“আজ আমার বিয়ে হয়ে গেছে সজীব নামের একটা মিষ্টি ছেলের সাথে। ইশ…আমি তো এখনো ওকে দেখিইনি, আগেই মিষ্টি বলে ফেললাম। হি হি হি “

সজীবের ভেতর কেমন একটা ঝটিকা নেমে এলো। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ব্যালকনিতে।আর একে একে ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগলো আর চোখ বুলাতে লাগলো ডায়েরির ভেতরের প্রতিটা লেখায়।

“ইশ আমার সজীবটা এত্ত মিষ্টি কেন! এত্ত এত্ত ভালবাসি আমি ওকে। কিন্তু….ও আমাকে একটুও ভালবাসে না কেন? নাই বা আমায় ভালবাসুক, তাতে কী! আমি সবসময় ওকেই ভালবাসবো!
সজীব+সাড়া!
ইশ! আমি তাহার সাড়া। হি হি হি”

আনমনেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো সজীবের। কত্ত পাগলী মেয়েটা। কত কিছু ওর অগোচরে লিখে রেখেছে।

” আজ আমার সজীবের জন্মদিন।আমি ওর জন্য একটা ছোট্ট কবিতা লিখেছি,

তুমি মানে
একরাশ মুগ্ধতা!
তুমি মানে
নীলাভ আকাশের শুভ্রতা!
তুমি মানে
খুব বেশি স্নিগ্ধতা!
তুমি মানে চঞ্চলতা!
তুমি মানে গভীরতা!
তুমি মানে মনের কোণের
হাজারো অব্যক্ত কথা!
তুমি বিহীন অস্থিরতা!

#সাড়া।তাহার সাড়া!

“সজীব কেনো তুমি এমন করলে?তোমাকে নিয়ে লিখা কবিতাটা পড়লে না কেনো?আমি তো তোমার কাছে যায়নি শুধু ডায়েরির পাতায় লিখে দিয়েছি, একটু তো পড়তে পারতে।এভাবে কেনো ছিঁড়ে ফেলে দিলে?”

বুকের বাঁ-পাশটায় সহসাই চিনচিন ব্যথা অনুভব করতে লাগলো সজীব। গলাটা ভীষণ
ভাবে কাঁপছে। চোখজোড়া বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে। তবুও থামছে না সজীব। চোখ বুলিয়ে চলেছে প্রতিটা লেখায়!

সহসাই থমকে গেল সজিব। ডায়েরির পাতার ভাঁজে শুকনো বকুল ফুলের মালা! খানিকটা সময় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো শুকিয়ে যাওয়া মালাটার দিকে। গভীর ভালবাসায় আলতো করে হাত বুলালো শুকনো বকুলের মালায়। কিছু সময় পর চোখ সরিয়ে নিয়ে লেখাতে চোখ বুলাতে লাগলো।

“তোমার মালা তোমার জন্যই রেখে গেলাম। তোমার সাবেরাকে দিয়ে দিও। আমি সত্যিই জানতাম না, এটা তুমি তোমার সাবেরার জন্য এনেছো। তোমার সাড়ার জন্য নয়।

না চাইতেও টপ কয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রুকণা ঝড়ে পরলো ডায়রীর মাঝখানটায়। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও চোখ বুলাতে লাগলো ডায়েরির পাতায়।

” যখন বুঝবে আমাকেই খুঁজবে! হয়তো আমি থাকবো,হয়তো থাকবো না। তাই মনের অব্যক্ত কথাগুলো তোমায় ডায়েরিতে লিখে দিলাম।যদি কখনো সময় হয়ে ওঠে তোমার ডায়েরি পড়ার, তাহলে একটু চোখ বুলিয়ে নিও আমার ক্ষুদ্র লেখার মাঝে। খুঁজে নিও মনের না বলা কতশত অব্যক্ত কথার মানে!”

“জানি একসময় তুমি শূন্যতা অনুভব করবে।তখন আমাকেই খুঁজবে। মন চাইবে তোমার ছোট্ট মনটার অব্যক্ত কথাগুলো কাউকে বলতে। কিন্তু…. দেখে নিও তুমি, কেউই থাকবে না… তখন তোমার পাশে। তোমার সাবেরাও থাকবে না। তবে…. হ্যাঁ আমি দূরে গিয়েও ঠিকই মিশে থাকবো তোমার অস্তিত্বের সাথে। আমি বিহীন তুমি শূন্যতায় ভুগবে প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে। তাই তো রেখে গেলাম আমার প্রিয় ডায়েরিটা। রেখে গেলাম অনেকগুলো সাদা পাতা, যাতে তুমি তোমার মনের অব্যক্ত কথাগুলো লিখে রাখতে পারো। তাহলে দু’টো মনের অব্যক্ত কথাগুলো মিলিয়ে তৈরী হবে একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প। গল্পের নাম দিতে ভুলে যেও না!গল্পের নাম  দিও ; ‘অব্যক্ত কথা’!”

“জানো?আমি না আজ চলে যাচ্ছি।তোমার থেকে অনেক অনেক দূরে। কতটা দূরে যাব, তা ঠিক পরিমাপ করতে পারবো না। এই দূরত্ব বোধহয় পরিমাপ করা যায় না। আর আসবো না তোমার সাবেরা আর তোমার মাঝে। আর কখনো তোমার সাবেরার জন্য আনা বকুলের মালা খোঁপায় গুঁজবো না। আর কখনো সং সেজে তোমাকে দেখানোর জন্য তোমার সামনে দাঁড়াবো না। তবে এমনিতেই আমাকে সাজলে সংয়ের মতোই লাগতো। সজীবের সংয়ের মতো দেখতে বউ! হি হি হি।সব বাঁধন ছিঁড়ে চলে যাচ্ছি আমি পরপারে।ভাল থেকো তুমি তোমার সাবেরাকে নিয়ে।”

আর কোন লিখা দেখতে পেল না সজীব।অস্থির হয়ে ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগলো।না__কোন লিখা নেই আর। পরের সবগুলো পাতা সাদাই রয়ে গেল। চোখ জোড়া বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে থাকলো চেয়ারে। না চাইতেও আজ সব কথাগুলো চোখের সামনে এলোমেলো হয়ে ভাসছে।

এক বছর আগের কথা।

সজীবের মা ছিলো না। বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্র সজীব। তাই সব সম্পত্তির মালিক সে একাই। বাবার আবদারে বিয়ে করে আনা হয় সাড়াকে। হ্যাংলা-পাতলা গড়নের মিষ্টি একটা মেয়ে। হাসলে গালের এক পাশে ছোট্ট একটা টোল পড়তো। গোলগোল মুখটায় সমসময় একটু টুকরো হাসি ঝুলিয়ে রাখতো। সজীবের করা প্রতিটা অপমান মূলক কথাতেও হেসে উড়িয়ে দিতো। সারাক্ষণ পুতুলের মতো এত বড় বাড়িটায় পায়চারি করে বেড়াতো। মাঝে মাঝে সত্যি সত্যি সজীবের কাছে সাড়াকে একটা ছোট্ট পুতুলই মনে হতো। তবে ছোট্ট পুতুলটার মন বোঝার সময় তার হয়ে উঠতো না।সেদিন ছিলো সাবেরার জন্মদিন। খুব শখ করে একটা বকুল ফুলের মালা কিনেছিলো সাবেরার জন্মদিনের গিফট হিসেবে। শুধু বকুলের মালাই নয় এছাড়াও দামী দামী অনেকগুলো গিফট কিনে ছিলো সজীব। সাড়া না বুঝেই বকুলের মালাটা নিয়ে খোঁপায় পড়ে ছিলো।সেদিন সজীব রেগে গিয়ে থাপ্পড় মারেছিলো সাড়াকে। শুধু থাপ্পড় মেরেও ক্ষান্ত হয়নি, অনেক অপমানমূলক কথাও বলেছিলো। গোলগাল মুখটায় সেদিন হাসির রেখা মিলিয়ে গিয়েছিলো। নীরবে অপরাধীদের মতো দু’চোখের পানি ফেলেছিলো। কিন্তু সেটা দেখার সময় হয়ে ওঠেনি সজীবের। অপমান করেই হানহনিয়ে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। সেদিনকার অপমানটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গেছিলো। সাড়া সেই আপমানটা সহ্য করতে পারেনি। পরদিন সকালে সজীব সেজেগুজে তৈরী হয়েছিলো সাবেরার সাথে সাক্ষাৎ করাতে যাওয়ার জন্য।ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজানো নেই দেখে সাড়াকে ডাকতে লাগলো। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। সজীব সাড়ার রুমে আসতেই থমকে দাঁড়ালো। বিচলিত হয়ে তাকিয়ে রইলো ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত সাড়ার দিকে। হ্যাঁ…সেদিনই সাড়া চিরতরে সজীবকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। একটা বছর মাটি কামড়ে পরেছিলো শুধু একটু ভালবাসা পাওয়ার জন্য। কত পাগলামীই না করেছিলো একটু ভালবাসা পাওয়ার জন্য।কিন্তু সেই পাওয়াটা আর হয়ে উঠলো না তার। কিন্তু সজীবের করা প্রতিটা অপমানের জের ধরে নিজের জীবনটা বিসর্জন দিয়ে ছিলো ঠিকই।খুব গবীর ঘরের মেয়ে ছিলো।যাওয়ার মতো কোন জায়গাই ছিলো না তার। তাই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেল।

আর ভাবতে পারছে না সজীব। চোখের দু’ধারে অশ্রুর ঢল নেমেছে। সেই ঢল থামানোর কোনো তাড়া নেই সজীবের। আজ না হয় অন্তত একটু মন খুলে কাঁদুক। ওই মেয়েটাকে তো অনেক কাঁদিয়ে ছিলো। সাড়া মারা যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন সাড়ার অভাব বুঝতে না পারলেও সময়ের সাথে সাথে ঠিকই সাড়ার শূন্যতা অনুভব করতে লাগলো। বেঁচে থেকে সজীবের হৃদয়ে নিজের নামটা লিখতে ব্যর্থ হলেও মরে গিয়ে সে সফল হয়েছে। সজীবের সমস্ত হৃদয় জুড়ে বিচরণ করতে শুরু করলো সে। সারাক্ষণ এ ঘর থেকে ও ঘর এলোমেলো শাড়ি পড়ে যে মেয়েটা ঘুরে বেড়াতে তার অভাব অনুভব করতে লাগলো সজীব। অনুভব করতে লাগলো সেই চঞ্চল চাহনি, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক টুকরো সেই হীরের হাসি। সব কিছুই একে একে অনুভব করতে লাগলো। সেই পাগলামো কথাবার্তা গুলোই সর্বদা কানের কাছে মধুর কণ্ঠ হয়ে বাজতে লাগলো।স্মৃতিগুলো যে বড্ড তাড়া করছে তাকে।কিছুতেই সাড়া নামের পুতুলটাকে সে ভুলতে পারছে না। চলে গিয়েও সে স্মৃতির বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখে গেছে। প্রতিনিয়ত স্বয়নে-স্বপনেও জ্বালাতে লাগলো সে।

সাড়ার লিখা সব কথাগুলোই সত্য। সত্যিই এখন আর মনের অব্যক্ত কথা শোনার মত কারোরই সময় নেই।সাবেরাও এখন কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। আগের মতো এখন আর খেয়াল রাখে না। শুধু টাকার প্রয়োজন হলেই সজীবের কাছে আসে। নয়তো খবরও রাখার প্রয়োজনবোধ করে না। সজীব বিয়ে করতে চায়,কিন্তু তাতেও সে রাজি না। আজ সাড়ার লেখা গুলো যেন তাকে সত্যিই অনেকটা নাড়িয়ে দিয়েছে। নিজের ভুলগুলো বুঝতে শিখিয়েছে। সাড়া বিহীন এক প্রগাড় শূন্যতা প্রতিটা ক্ষেত্রে অনুভব করছে সে। ভাবতেই বুক ফেঁটে যাচ্ছে সজীবের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
“সাড়া কেন চলে গেলে? আমার মনের অব্যক্ত কথাগুলো যে আমি ডায়েরির পাতায় নয়, তোমার মনের খাতায় লিখতে চাই।”

সহসাই পুরো ঘরময় কারো খিলখিল হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। সজীব ব্যালকনি ছেড়ে দ্রুত পায়ে এগুলো সামনের দিকে। ঘরের প্রতিটা কোণে খুঁজতে লাগলো তার সাড়াকে। তার মনের অব্যক্ত কথাগুলোর জানান দিতে। কিন্তু সাড়ার; কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সে যে চলে গেছে এপার ছেড়ে ওপারে!

সমাপ্ত

Related Post

//ofgogoatan.com/afu.php?zoneid=3060777