খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১০


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

ঈশা সেই কখন থেকে আনমনে পথের এক পাশে তাকিয়ে আছে।মাথাটা অটোর সাথে ঠেকিয়ে বসে রয়েছে।একটুও চোখের পলক পরছে না।ঈশান ব্যতিব্যস্ত হয়ে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে ঈশাকে।কিন্তু ঈশা যেন কোন এক গভীর চিন্তায় মগ্ন। তাই ঈশানের করা প্রশ্নগুলো ঈশার কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না।সহসাই অপর সিট থেকে একটা মৃদু কণ্ঠ কানে ভেসে আসলো ঈশানের।”জানেন”!
ঈশান হকচকিয়ে তাকালো ঈশার দিকে।বুঝতে চেষ্টা করলো এটা ঈশার কথা কিনা।তখনই দেখলো ঈশার ঠোঁট জোড়া মৃদুভাবে নড়ে উঠেছে।হয়তো কিছু বলতে চাইছে।ঈশান কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
_বল!
ঈশা যেন এতক্ষণ এই জবাবের অপেক্ষাতেই ছিল।ঈশান বল বলতেই টেপ রেকর্ডের মত পটপট করে বলতে আরম্ভ করলো,
_জানেন!আমার মা আমাকে সবসময় ঈশু বলে ডাকতো।দিনের পুরোটা সময় যেন মা আমার পিছনেই ব্যয় করে দিত।আমাকে গোসল করিয়ে দেওয়া,খাইয়ে দেওয়া,সুন্দর সুন্দর ফ্রক পড়িয়ে দেওয়া,মাথায় দু’পাশে সমসময় দুইটা ঝুঁটি বেধে দিত।আমিই যেন মায়ের একটা ছোটখাট পৃথিবী ছিলাম।প্রিতিদিন মা আমাকে আদর্শলিপি বই নিয়ে পড়তে বসাতো।জানেন,এখনও মনে পরে,আমি আধো আধো গলায় অ আ পড়তাম।মা আমার কণ্ঠ শুনেই খুশিতে হেসে ফেলতেন।এখনও যেন সবকিছু চোখের সামনে ভাসে বেড়াচ্ছে।রাতে আমাকে সবসময় বুকের সাথে জড়িয়ে ঘুম পারাতেন।বাবাও আমি অন্ত প্রাণ ছিলাম।বাবা তখনও মুদির দোকান করতেন।তবে তখন বাবার এই দোকানে ভালই রোজগার হত।মায়ের মুখে শুনতাম
দাদা আর দাদু নাকি মা কে লক্ষ্মী বলতেন।কারণ বাবা, মাকে বিয়ে করার পরই নাকি দাদুর সংসারে অনেক আয় উন্নতি হয়।বাবার দোকানও খুব ভাল চলছিলো।সবার চোখের মণি ছিলাম আমি।খুব সুখী একটা পটিবার ছিল আমাদের।ভালবাসা যেন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।কিন্তু সুখটা যে বড় বেঈমান।বেশিদিন আমার কপালে সেটে থাকলো না।অকালেই সব কেড়ে নিয়ে চলে গেল।তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি।মায়ের হঠাৎই একদিন খুব শরীর খারাপ হয়।হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে ধরা পরে মায়ের লিভার খারাপ হয়ে গেছে।ডক্টর ইমারজেন্সি বলেছিল বরিশাল নিয়ে যেতে।বাবা এক সপ্তাহের মধ্যে বেশ খানিক টাকা জমিয়ে মাকে নিয়ে বরিশাল রওনা দেন।বরিশাল যাওয়ার পরদিনও আবার মাকে নিয়ে ভোলাতে ফিরে আসে।তবে জীবিত নয় মৃত নিয়ে ফিরে আসে।যেই মা আমার যাওয়ার সময়ও আমাকে আদর করেছিল অথচ ফেরার সময় লাশ হয়ে ফিয়ে ছিল।খুব বেঈমান মা আমার। আমাকে রেখেই একা একা সুদূরে পাড়ি জমিয়েছে।কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠলো ঈশার। দু’চোখ বেয়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত জল গড়িয়ে পরতে লাগলো।ঈশানের খুব কষ্ট লাগছে।সান্ত্বনা দেওয়ার কোন বানীই খুঁজে পাচ্ছে না।নিজের সিট ছেড়ে ঈশার পাশে গিয়ে বসলো।ঈশার বাঁ হাতটা নিজের হাতের মুঠোতে নিয়ে নিল।ঈশাও নির্বিকার!কোন টু’শব্দ না করেই  নিজের মত বলে যেতে লাগলো।ড্রাইভারকে ঈশারায় খুব আস্তে গাড়ি চালাতে বলল ঈশান।
_সেদিনের পর মা আর কখনো আমায় আদর করেনি।সবাই সেদিন কেঁদেছিল।আমিও খুব কেঁদেছিলাম সেদিন।জানেন সেদিন বাবাকেও খুব কাঁদতে দেখেছিলাম।তারপর মা হারা হয়ে যেন সবার ভালবাসা আরও বেশিই পেতে লাগলাম।বছর তি’নেক পরেই দাদা-দাদি দু’জনকেই হারিয়ে ফেললাম।দাদার ছয় মাস পর দাদিও চিরবিদায় নিলেন।বাবার সংসার দেখাশোনার জন্য কেউ রইলো না।শেষমেশ বাবা অন্যত্র বিয়ে করলেন।এই যেন সুখগুলো ক্রমে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছিলো।তবুও আমি খুব খুশি ছিলাম।বাবার নতুন বিয়ে করা বউকে মা বলেই ডাকতাম।প্রায়ই মা আমাকে বকতো,মারতো।তবুও আমি মায়ের গা ঘেঁষে থাকতাম।যখন মা আমাকে একটু কাছে টেনে নিত আমিও আহ্লাদে আটখানা হয়ে পরতাম।শেষমেশ সেই ভালবাসাটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়ে পরলাম।যখন এশার জন্ম হয়।দিন দিনই মা আমাকে অবহেলা করতে লাগল।বাবাও কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছিলো।কোনরকম এস.এস.সি পরীক্ষা দিলাম।এ গ্রেড পেয়ে পাশ করলাম।কিন্তু বাবা জানিয়ে দিল আমাকে আর পড়াতে পারবে না।অথচ যখন মা বেঁচেছিল তখন বলতো আমাকে ডাক্তারি পরাবে।আমিও বলেছি ডাক্তারি পরবো।মা বলেছে আমার যেটা ইচ্ছা সেটাই পড়াবে। কারণ মা আমার ওপর কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইতো না।আর অথচ বাবা তখন বেমালুম সবটা ভুলে গেল।আমিও নাছোড়বান্দা, আমি পড়বোই।বাবা বড় মামাকে জানায় আমাকে পড়াতে পারবে না।মামা বাবার সাথে একমত হতে পারলো না।মামা আমাকে নিজের কাছে নিয়ে যান।মামার সেখানেই দু’বছর থেকে ইন্টারমিডিয়েটের পরীক্ষা শেষ করি।রেজাল্ট খুব একটা খারাপ হয় না।ভাগ্য বোধহয় ফেবারে ছিল না।তাই অল্পের জন্য এ প্লাস পেলাম না।মামার সংসার বড় হয়।ছেলে-মেয়ের খরচ,সংসারের খরচ আমার খরচ চালিয়ে মামা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলো।মামাও তো আর আহামরি খুব বড়লোক না।শেষমেশ মামাও আমাকে পড়ানোর হাল ছেড়ে দেন।আবার বাসায় চলে আসলাম।বি বি এ এডমিশনের জন্য প্রায় ছ’হাজার টাকার মত লাগবে।বাবাকে বললাম,বাবা নির্দিধায় না করে দিলেন।আমিও হাল ছাড়লাম না।আমাকে পড়তেই হবে।হন্যে হয়ে প্রাইভেট খুঁজতে লাগলাম।পেয়েও ছিলাম দুইটা।মাইনে একেবারে কম টাকা দেবে।কিন্তু আমার যে মাসখানেকের মধ্যেই ছ’হাজার টাকা দরকার।আর সেই টাকা এই দুই প্রাইভেট দিয়ে পূরন করতে গেলে প্রায় তিন মাসের মত সময় লেগে যাবে।কিন্তু আমার হাতে যে অত সময় নেই।বাধ্য হয়ে আমাদের এলাকার মহিন চাচার সাথে কন্টাক করলাম।যিনি আপনাদের বাসায় রঙের কাজের জন্য নিয়ে গেছিলো।ওনার হাত-পায়ে পরলাম যেন আমাকে কাজে নেয়।উনি বলেছিলেন,তুই মেয়ে মানুষ, তুই এসব ছেলেদের কাজ পারবি না।তবুও আমি খুব জোর করেছিলাম মহিন চাচাকে।আমার কাকুতিতে মন গলেছিল মহিন চাচার।সেদিন যেন চাচা আমার জীবনে আশির্বাদ স্বরূপ হয়ে ফিরেছিলেন।যার জন্যই আমি আজ পড়তে পারছি।প্রায় বিশদিনের মত কাজ করেছিলাম।যা টাকা পেয়েছি তা দিয়ে আমার এডমিশন আলহামদুলিল্লাহ ভালভাবেই হয়ে যায়।এই হল আমার জীবন কাহিনী। কথাগুলো বলেই ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো ঈশা।গালের দু’পাশে জলের ধারা শুকিয়ে দাগ পরে গেছে।ঈশান অটোটা থামিয়ে দোকান থেকে একটা পানির বোতল কিনে নিয়ে আসলো।
_ঈশা মুখটা ধুয়ে নাও।
ঈশা কোন দ্বিরুক্তি না করেই অটো থেকে নেমে মুখটা ধুয়ে নিল।ঈশান এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে টিসু বের করে দিল।ঈশা মুখটা মুছে আবারও নিজের সিটে গিয়ে বসলো।

ছোট হয়ে গেছে।কিন্তু কিচ্ছু করার নাই আমি খুবই ব্যস্ত। তাই গল্প লিখার টাইম পাচ্ছি না।

চলবে,,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777