খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১২


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

আনমনে দু’জনে হেঁটে চলেছে রাস্তার পাশ ঘেঁষে।সম্পর্কটা এখন আপনি থেকে তুমিতে রুপ নিয়েছে।কেন যেন দু’টো মানুষই খুব সঙ্গ চায় একজন আর একজনের।যেন কত বহুকাল আগের চেনা একজন আর একজনের।ইদানিং ঈশার বাড়িতে থাকতে একটুও ভাল লাগছে না।সারাক্ষণ বন্ধুর সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে।তার সাথে কথাগুলো সেয়ার করতে ভাল লাগছে।বাড়িতে যেতে একদমই মন টানছে না।মনটা যেন খুব বেশিই উড়ু উড়ু করছে।ইচ্ছে করছে অজানা এক পথে হারিয়ে যেতে এই বন্ধুটির হাত ধরে।কিন্তু সেটা যে কোনভাবেই সম্ভব না।ভেবেই একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ঈশার বুক চিরে।নিরবতা ভেঙ্গে ঈশাই বলে উঠলো,
_ঈশান, কাল কলেজে আসবো না।
_কেন?
_কাল থেকে কাজে জয়েন করবো ভাবছি।অনেকদিন ধরে কাজে যাই না।জমানো টাকাও শেষ।এভাবে চললে তো হিমশিম খেয়ে যাব।আজ আবার বই গুলোও কিনবো ভাবছি।তাহলে হাত পুরো খালি হয়ে যাব।আর তোমার কাছে আমার লুকো চাপার কিছু নেই।তোমাকে নিজের খুব কাছের মনে হয় ঈশান।সবচেয়ে ভাল বন্ধু মনে হয়।তাই নির্দিধায় তোমার কাছে সব সেয়ার করি।এটাকে কখনো আমার দুর্বলতা ভেব না প্লিজ।তাহলে খুব কষ্ট পাবো।
_তুমি এসব কী বলছো!আর কেনই বা বলছো এভাবে।তোমার কী মনে হয় আমি ওই রকম?
_কখনো মনে হয় না।কিন্তু কী….বল তো!জীবনে অনেকগুলো ধাক্কা সামলিয়ে এ অব্দি এসেছি।যদি কখনো হোচট খেয়ে পরে যাই।তাই….. খুব ভয় লাগে।
ঈশান হেসে ঈশার হাতটা ধরলো।অভয় দিয়ে বললো,
_এরকমটা কখনোই হবে না।নিশ্চিন্ত থাক।আমার খুব ভাল লাগে যখন তুমি আমার কাছে সবটা সেয়ার করো,তখন মনে হয় সত্যিই আমি তোমার কাছের কেউ।নিজেকে কেন যেন তোমার মত বন্ধু পেয়ে খুব ভাগ্যবান মনে হয়।

ঈশানের কথা শুনে মৃদুভাবে হাসলো ঈশা।
_ঈশু!
ঈশানের মুখে ঈশু ডাক শুনে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ঈশানের দিকে।ঈশান অনুনয়ের স্বরে বললো,
_একটা অনুরোধ রাখবে?
-এভাবে বলছো কেন?তুমি নির্দিধায় বলতে পারো।আমি অবশ্যই রাখার চেষ্টা করবো।
_প্লিজ…ঈশা! তুমি এই কাজটা আর করো না।আমি চাই না তুমি এই কাজটা করো।
ঈশার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।ঠোঁটোর কোণের হাসিটা সহসাই উবে গেল।
_ঈশান…সত্যি বলতে আমারও এই কাজটা করতে ভাল লাগছে না।কিন্তু কী করবো বল?আমাদের এই গ্রামে প্রাইভেট পড়ালে মাসে যা পাই তা দিয়ে আমার একটুও চলে না।আর আমাকে কেই বা এত টাকা দেবে পড়ার খরচ চালাতে।প্রাইভেট পড়তে হয় না।তুমি আছো তাই,হেল্প করো।কিন্তু এছাড়াও আমার নিজের দরকারি টুকটাক কেনাকাটা, যাতায়াত খরচ এগুলি কোথায় পাব।তাই কাজটা আমাকে করতেই হচ্ছে।
_আমি তোমাকে আমাদের বাসার কাছে টিউশন ঠিক কর দেই?
_নিশ্চুপ
_মাসে বারো দিন পড়ালেই চলবে।বেশ ধনী পরিবার।আমার বন্ধুর বাড়ি।ও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।ওর বড় ভাইর ছেলে এইবার ক্লাস ফাইভে পড়ে।বলেছে ওরা পাঁচ হাজার টাকা দেবে।শুধু ইংরেজি আর অংক এই দুইটা দেখলেই চলবে।
ঈশার মুখটা খুশিতে জ্বলমল করে উঠলো।
_কোন সমস্যা নেই আমার অংক, ইংরেজিতে। আমি বেশ ভালই পাড়ি।
ঈশা নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ করে কথাগুলো বললো।ঈশান মিটিমিটি হাসছে দেখে, ঈশা সবটা বুঝতে পারলো।লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলো।
_লজ্জাবতী ললনা… আর লজ্জা পেতে হবে না।কাল থেকেই সেখানে যয়েন করো।আমি ফোনে জানিয়ে দেব।ওফ…তোমার তো আবার ফোন নেই।কী করা যায়…বল তো?
_কাল কলেজে আসি তাহলে তুমি ফোন করে আজই টাইমটা জেনে নাও।আমি কাল সেই টাইমে তোমাদের বাসায় যাব। সেখান থেকে তুমি আমাকে ওই বাড়িতে নিয়ে যাবে।
_হুম… খুব ভাল আইডিয়া দিয়েছো।তাহলে চল বইগুলো কিনে নেই।
_ হুম…চল।

ঈশা সবগুলো বই নিলো।যখন জিজ্ঞেস করলো কত টাকা হয়েছে।তখন লোকটা বললো এক হাজার টাকা দিতে।
_কী বলেন? বইর মূল্য এত কম?
_হ্যাঁ…আফা এইবার বইর মূল্য অনেক কম।ঈশান কিছুতেই ঈশার দিকে তাকাচ্ছে না অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।ঈশা ঈশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
_এই ঈশান সত্যিই কি বইর দাম এত কম?আর তুমি তো সব বই কিনেছো।সবগুলো কি এক হাজার টাকায় কিনেছো?
ঈশান কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।তবুও আমতা আমতা করে গলা খাকিয়ে কোনরকম বললো,
_হ্যাঁ তো। আমি তো এই দামেই বইগুলো সব কিনেছি।
কিন্তু ঈশার যেন বিস্ময়ে ঘোরই কাটছে না।কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না বইর মূল্য এত কম!বইগুলোর মূল্য পে করে। ঈশা গিয়ে অটোতে উঠলো। তখনও বইর মূল্যের ব্যাপারটা মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো।কী করে ছ’টা বইর দাম এত কম হয়।কোনভাবেই হিসাব মেলাতে পারছে না ঈশা।গাড়ি চলেছে আপনমনে আর ঈশা তখনও নিজ মনে হিসাম কষছে।

ঈশান ঈশাকে অটোতে উঠিয়ে দিয়েই লাইব্রেরিতে ফিরে এলো।অনেকবার ঈশাকে বলেছে রিক্সায় করে যেতে, ভাড়া ঈশান মিটিয়ে দেব কিন্তু ঈশা এমন জেদ ধরলো অগত্যা ঈশান অটোতেই উঠিয়ে দিল ঈশাকে।

_ভাইয়া কত টাকা পাবেন আপনি?
_আর দেড় বারোশো টাকা দেন।
ঈশান পকেট থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে একটা এক হাজার টাকার নোট আর দুইটা একশত টাকার নোট এগিয়ে দিলো দোকানদারের দিকে।মুখের কোণে প্রশস্থ একটা হাসি ঝুলিয়ে বললো,
_অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।সত্যিই এই হেল্পটুকু আমার দরকার ছিলো।(ঈশান আগে থেকেই জানতো ঈশা আজ বই কিনবে।ওইদিন কলেজে মীরার সাথে কথা কাটাকাটি হওয়ার পর সেদিন আর বই কেনা হয়নি।তাই আজ ঈশান কলেজে যাওয়ার পথে দোকানদারকে বলে রেখেছিলো সবটা।)
দোকানদারও হেসে ঈশানের দিকে হাত বাড়ালো।ঈশানও হাতটা বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে লাইব্রেরি ছেড়ে বেড়িয়ে এসে সোজা বাড়ির পথ ধরলো।ক্ষুধায় পেট চো চো করছে।ঈশার বারণ তাই খেতেও পারছে না।(ঈশা বলে দিয়েছে ভুলেও যেন ঈশান বাহিরের খাবার না খায়।)একটা রিক্সা ডেকে উঠে পরলো ঈশান।

ঈশা বাসায় এসে ভাত খেতে নিয়েই দেখে এক গাদা এঁটো বাসন-কোসন রান্নাঘরে জমানো।কোন খাবার খাওয়ার মত অবশিষ্ট নেই।সকাল সকাল সব রান্না সেরে গিয়েছিলো।সালেহার বাপের বাড়ি থেকে আজ সালেহার ভাই-বোন এসেছে সবাই মিলে সব খেয়ে ফেলছে।কেউ একজন যে না খেয়ে আছে সেদিকে কোন হুঁশ নেই তাদের।আর হুঁশ থাকলেই বা কী!কে ভাবে ওর কথা।ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বাজে।ক্ষুধায় পেটের মধ্যে উল্টাচ্ছে-পাল্টাচ্ছে।কী খাবে ভেবে পাচ্ছে না।শুধু বড় গামলাটায় খানিকটা ভাত অবশিষ্ট রয়েছে।রান্নাঘর ছেড়ে এসে ফ্রিজটা খুললো।ফ্রিজে অনেকগুলো ডিম সাজানো।ভয় লাগতাছে ডিম ধরতে, যদি আবার সালেহা বকাবকি করে।তবুও ক্ষিধের মাঝে বকাবকিকে গুরুত্ব দিলো না ঈশা।আগে পেট ঠিক তো, দুনিয়া ঠিক।তাড়াতাড়ি পেয়াজ,কাঁচা মরিচ কুচি করে ডিমটা ভেজে নিয়ে ভাত কয়টা খেয়ে নিলো।এরপর আবার ওড়না কোমরে গুঁজে কাজে নেমে পরলো।রাতেও যে আবার রান্না চাপাতে হবে।

আজ ঈশানের বন্ধুর বাসায় এসেছে প্রাইভেট পড়াতে।বাড়ির পরিবেশ আর সবার চলন-নলন দেখে বোঝা যাচ্ছে খুব বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে এরা।সবাই ষশানের সাথে মিশছে খুব ভালভাবে।ঈশানও সবার সাথে হেসে হেসে কথাবার্তা বলছে।ঈশানের বন্ধুও এসেছে বাড়িতে।তার সাথে সে সখ্যতা ঈশানের।হাত নেড়ে নেড়ে দু’জনে কথা বলছে।ঈশানের সেই বন্ধুটা বারবার কথা মাঝে আড় চোখে দেখছে ঈশাকে।খুব অসহ্য লাগছে ঈশার।ঈশানের বন্ধুর এমন দৃষ্টিতে খুবই অস্বস্তি লাগছে ঈশার।তাই গুটিসুটি হয়ে সোফার এক কোণায় বসে রইলো।হঠাৎই ঈশান ঈশাকে ডেকে উঠলো,
_ঈশা?
_হু।
এই হলো আমার বন্ধু মিরাজ
ঈশা কোনরকম সেদিকে তাকিয়ে হালকা একটু হাসি দিয়ে সালাম জানালো।কিন্তু মিরাজ সালামের জওয়াব না দিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে ঈশার দিকে।

গল্পটা ভাল না লাগলে বলবেন। দেওয়া বন্ধ করে দেব।

চলবে,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777