খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১৪


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

আজ অনেক ধরেই কাজে জয়েন করেছে ঈশা।তাই কলেজেও যেতে পারছে না।বাড়িতেই রাতের সব কাজ শেষ একে একটু পড়তে বসে।তবে ঈশানের কথা খুব মনে পরে।খুব দেখতে ইচ্ছে করে ঈশানকে।কিন্তু কাজ না করে কলেজে গিয়ে বসে থাকলে তো আর হবে না।নিজের কাজ যে নিজেকেই করতে হবে নয়তো চলবে কী করে।এমনিতেই এখন কাজ করে যা পায় সেখান থেকে কিছু অংশ ওর বাবাকে দিতে হয়।না দিয়েও তো উপায় নেই।সে নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়।প্রতিনিয়ত এসব নিয়ে শুনতেও মন সায় দেয় না।তাই সালেহা যা বলে চুপচাপ সবটা মেনে নেয় ঈশা।আজ বড্ড ক্লান্ত লাগছে।শরীরটা ভিষণ ম্যাচম্যাচ করছে,আর কোন জোর পাচ্ছে না গায়ে।মনে হয় জ্বর টর উঠবে। তাই কাজ সেরেই এসেই বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলো।কখন যে চোখ জোড়াতে তন্দ্রা লেগে গেল টেরই পেলো না।

ঈশানের মনটা প্রচন্ডভাবে ছটফট করছে।আর ভাল লাগছে না।আজ কতদিন হয়ে গেল,ঈশা কলেজে আসছে না।খুব খারাপ লাগছে ঈশানের।একটুখানি চোখের দেখা না পাওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি নাই।খানিকটা সময় নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবলো ঈশান।তারপর এগুলো মিলির রুমে।দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আস্তে করে ডাকলো,
_মিলি,মিলি
মিলি বিছানায় শুয়ে শুয়েই পড়ছিলো।ঈশানের ডাক শুনেই উঠে বসলো।পাশ থেকে ওড়নাটা নিয়ে ভাল করে গায়ে জড়িয়ে নিলো।
_হ্যাঁ…. ভাইয়া।ভেতরে আয়।
ঈশান ভেতরে গিয়ে খাটের এক পাশটায় বসলো।
_একটা কথা ছিলো।
_বল।এমন ভাব করছিস মনে হয়, আমি তোর গার্জিয়ান। আর তাই ভয় পাচ্ছিস!
_আরেহ তেমন ব্যাপার না।আমার সাথে এক জায়গায় যেতে পারবি?
_কোথায়?এই সন্ধ্যাবেলা কোথাও গেলে মা রাগ করবে তো।
_আমার সাথে গেলে রাগ করবে না।চল তুই। আমি ছোট মাকে বলবো।

অতঃপর দু’জন ভাই-বোন মিলে বাড়ি থেকে বের হলো।

_এই আপু উঠছিস না কেন?রাতের রান্না করবে কে?তাড়াতাড়ি ওঠ।
_এশা…আমার আজ শরীরটা খুব খারাপ লাগছে রে।তুই রান্না কর আজ।আমি কাল থেকে রান্না করবো।
_পারবো না আমি। আমি গেলাম তুই উঠে রান্না করে ফেল।একটু পরে বাবা আসবে দোকান থেকে।
কথাগুলো বলেই এশা চলে গেল।খানিকটা সময় নিয়ে মরার মত বিছানায় পড়ে থাকলো ঈশা। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।হাত-পা গুলো মনে হয় ভেঙে গেছে।একটুও জোড় পাচ্ছে না।মাথাটাও প্রচন্ডরকম ব্যথা করছে।চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসছে।শরীরে যেন কোন শক্তি নেই। উঠে দাঁড়াতে গিয়েও যেন মনে হচ্ছে পড়ে যাবে। তবুও দেয়াল ধরে ধরে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে এগুলো।চুলায় ভাত বসিয়ে লাকড়ি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলো।পাশেই একটা মোড়াতে বসে আছে ঈশা।তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চুলার মধ্যে জলন্ত তীব্র আগুনের দিকে।ইচ্ছে করছে নিজেকে এই আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিতে!এই জীবন রেখে কী লাভ!যেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও দেখার মত কেউ নেই,সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কেউ নেই।ক্ষণিক বাদেই মনের মধ্যে পুষে রাখা রাগটা গলে জল হয়ে কান্নার বেগ হয়ে ঝড়ে পড়লো।হাঁটুর ওপর মুখটা দিয়ে চুপচাপ বসে আছে।আর নিরবে চোখদু’টো বেয়ে জল গড়াচ্ছে।

একটুবাদেই কারো দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ পেয়ে রান্নাঘর ছেড়ে এগুলো সদর দরজায়।গায়ের ওড়নাটা ভাল করে মাথায় মুড়িয়ে নিলো।চোখের পানি ভালকরে ওড়নায় মুছে দরজাটা খুললো ঈশা।দরজা খুলতেই দুজন তরুণ-তরুণী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো।ঈশা ঘোর লাগা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আগত মেহমানদের দিকে।মিলি মুখে এক ঝলক হাসি ফুটিয়েই ঝাপটে ধরলো ঈশাকে।
_এমা ঈশা আপু তোমার তো গা জ্বরে পুরে যাচ্ছে। এই শরীর নিয়ে তুমি কী করে এখনও দাঁড়িয়ে আছো?
কথাটা বলেই ঈশাকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো।মিলিও ঈশার পাশে গিয়ে বসলো।
_কেমন আছো তোমরা?হঠাৎ এই সময়?
ঈশান তখনও শীতল চোখে তাকিয়ে আছে ঈশার দিকে।ঈশার এমন মলিন মখুটা যে, প্রচন্ডভাবে দাগ কাঁটছে ঈশানের মনে।
_আমি ভাল আছি।কিন্তু তুমি তো ভাল নেই।(মিলি)
ঈশা একটা শুষ্ক হাসি দিলো।যেই হাসিতে নেই কোন প্রাণ। নেই কোন উচ্ছলতা!আছে শুধু বিশাল এক বিষাদময়তার ছাপ!
_কে বললো ভাল নেই?ভাল আছি তো।ঈশান তুমি কেমন আছো?আর চুপ করে আছো কথা বলছো না কেন?
_কী কথা বলবো তোমার সাথে?সেই যে দেখা হয়েছিলো তারপর থেকেই তো লাপাত্তা! কেন কথা বলবো তোমার সাথে?
_আপু আমি একটু তোমার রুমে যাব?
_আচ্ছা চল আমার সাথে।বলেই ঈশা নিজের রুমে নিয়ে আসলো।
_আপু আমি একটু ওয়াশরুমে যাব। তুমি ভাইয়ার কাছে যাও।(মিলি)
_আচ্ছা।
(মিলি ইচ্ছে করেই ওদের কথা বলার সুযোগ করে দিলো)
ঈশা আবারও সেখানে গিয়ে বিছানার ওপর পা  ঝুলিয়ে বসলো।সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো ঈশানের দিকে দেখলো ঈশান নিচের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটছে।
_এখনো অভিমান করে থাকবে?
ঈশার কণ্ঠ শুনেই ঈশার দিকে তাকালো।কিছুটা সময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো ঈশার দিকে।তারপর আবেগমাখা কণ্ঠে বললো,
_কে হই আমি তোমার?যে অভিমান করে থাকবো।
ঈশানের বলা ছোট্ট কথাটা প্রচন্ড ভাবে ঈশাকে নাড়িয়ে দিলো।চোখজোড়া মুহূর্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।বিনয়ী ভাবে বললো,
_প্লিজ….ঈশান! এভাবে বল না।খুব কষ্ট পাই আমি।
ঈশান ঈশার অবস্থা বুঝতে পেরে আর হার্ট করলো না।একটুখানি এগিয়ে গেল ঈশার দিকে।আলতো করে হাত রাখলো ঈশার কপালে।
_জ্বর বাঁধিয়েছো কীভাবে?
_ভালই ছিলাম।হঠাৎই আজ বিকেলে কাজে থাকতেই ভিষণভাবে শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করলো।
_মেডিসিন নিয়েছো?
_আরেহ জ্বরই তো উঠলো একটু আগে।তুমি বসো আমি আসছি।ঈশা উঠতে নিলেই ঈশান হাত ধরে আবারও ঈশাকে বসিয়ে দেয়।
_তুমি এখন কোথাও যাবে না।চুপচাপ এখানে বসে থাকো।
_ঈশান চুলায় রান্না বসিয়েছি।
_এই অবস্থায় তুমি রান্না করছো কেন?আর কেউ বাসায় নেই নাকি?
তখনই সামনের বারান্দায় প্রবেশ করলো ওমর।ঈশানকে দেখেই সালাম জানালো।
_আপু মা বলেছে রান্না আর কতদূর।
_ভাত হয়ে এসেছে এখন তরকারিটা রান্না করবো।বলেই সামনের বারান্দা ছেড়ে বেরিয়ে আসলো।
ওমরও পিছু পিছু গেল।
_আপু মেহমানদের তাড়াডড়ি বিদায় কর।নয়তো মা দেখলে পুরো বাড়ি মাথায় করবে।তুই তাড়াতাড়ি একটু চা বসা। আমি ততক্ষণে মায়ের রুমে এশা আর মাকে আটকাচ্ছি নানা কথাবার্তা বলে।
ঈশা হেসে ফেললো ভাইর কথা শুনে।হাত বুলিয়ে ছোট্ট ওমরের চুলগুলো নেড়ে দিল।তারপর এগুলো রান্নাঘরে।ঝটপট দু’কাপ চা আর একটা পিরিচে বিস্কুট সাজিয়ে সামনের বারান্দায় আসলো।ততক্ষণে মিলিও সেখানে চলে এসেছে।দু’জনের হাতে জোড় করে কসপ তুলে দিলো।
_এসব কেন করতে গেলে?এসেছি তোমাকে দেখতে।এসব খেতে নয়।(ঈশান)
_আরে মশাই মেহমানদারী করা সুন্নত!বেশি কিছু তো আর করিনি।এইটুকু করলে এমন কিছুই হয় না।
_আপু ঔষধ খেও কিন্তু নয়তো জ্বর আরও বাড়বে।(মিলি)
_হুম দেখি কী হয়।কাল ঔষধ আনবো।

ওরা যাওয়ার আগে একটা প্যাকেটে মোড়ানো কিছু একটা, ঈশান ঈশার হাতে গুঁজে দিলো।ঈশা বারবার করে জিজ্ঞেস করলো এটা কী বা আর কেনই দিচ্ছো।কিন্তু ঈশান কিছুতেই মুখ খুললো না।জোর করে ঈশার কাছে রেখে গেল।ঈশাও ঈশানের পিরাপিরিতে আর না করতে পারলো না।অগত্যা নিজের কাছে রেখে দিলো।ওরা চলে যেতেই প্যাকেটটা এনে বালিশের নিচে রাখলো।রানাবান্না শেষ করে বেসিনে হাতটা ভাল করে ধুয়ে নিয়ে এগুলো নিজের রুমের দিকে তখনই দরজায় টোকা পরলো।

চলবে,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777