খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১৫


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

ঈশা এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই ভিষণভাবে চমকে উঠলো।তার সামনে ঈশান হাসি মাখা মুখে দাঁড়িয়ে আছে।ঈশা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
_তুমি এখন?
ঈশান সহসাই ঈশার ডান হাতটা ধরলো।ঈশা বিস্ময় নিয়ে ঈশানের দিকে তাকিয়ে আছে।ঈশান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ঈশার হাতে পিন আপ করা কাগজে ঔষধ গুলো ঈশার হাতে তুলে দিলো।
_ভাত খেয়ে ঔষধ গুলো খেয়ে নেবে।নিয়ম ঔষধের গায়ে লিখা আছে আর হ্যাঁ ভুলেও না খেয়ে ঔষধ খাবে না।তোমার এমন মলিন মুখটা দেখতে ভাল লাগে না আমার।বড্ড বোরিং লাগে।কথাগুলো বলেই আস্তে করে ঈশার গালটা টেনে দিয়ে আলতো করে ঈশানের হাতটা ঈশার গালে ছোঁয়ালো।ঈশা তখনও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইলো ঈশানের হাসিভরা মুখটার পানে। হাসলেই অসম্ভব রকম সুন্দর করে টোল পরে ঈশানের গালে।ছেলেদের হাসলে গালে টোল পড়ে খুব একটা দেখা যায় না।ঈশান চলে গেল।তখনও ঈশা ঘোর লাগা দৃষ্টি নিয়ে ঈশানের পথ পানে তাকিয়ে রইলো।আর কোন কথাই যেন মুখ থেকে বের হলো না।তবে সহসাই ঘটনার আকস্মিকতায় চোখজোড়া বেয়ে উষ্ণ পানির ধারা বইতে লাগলো।পানির ধারা ঠোঁট অব্দি আসতে ধ্যান ভাঙলো ঈশার।ওড়নার আঁচলে চোখ জোড়া মুছে নিলো।সত্যিই বন্ধুত্ব বুঝি একেই বলে।ভেবেই ঔষধের প্যাকেটার দিকে খানিকটা সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো।আজ এই ঔষধ গুলো নিজের বাবা এনে দেওয়ার কথা ছিলো।বইগুলো কেনার টাকা বাবার দেওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু না….বাবা এমন কিছুই করেনি।ঈশান নামের এই বন্ধুটা তার জীবনে যেন কোন দূত হয়ে এসেছে।না চাইতেই একের ওর এক সব চাওয়াগুলো পূরন করে চলেছে নির্দিধায়।কত সহজেই ওইদিন মিথ্যে বলে বইর টাকাগুলো দিয়ে দিলো।একটাবার বুঝতেও দিলো না।পরদিন দোকানদারকে সন্দেহবশত বইগুলোর মূল্য জিজ্ঞেস না করলে সঠিকটা বোধহয় জানাই হতো না।ভাবতে ভাবতেই এশার গলা ভেসে আসলো পাশের ঘর থেকে।ঈশা তাড়াতাড়ি ওড়না দিয়ে প্যাকেটটা আড়াল করে নিলো।এশা ঈশার সামনে দাঁড়িয়ে সন্দেহভাজন দৃষ্টি নিয়ে ঈশার পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিলো।খানিকটা সময় দেখার পর চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে বসলো,
_তোর হাতে কী?
ঈশা এই ভয়টাই পেয়েছিলো।ভয়ে গলা কাঁপছে।এমনিতেই শরীরটা ভাল নেই।তার উপর এই জেরার মুখে পরে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি ঈশার।হালকা করে গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে উঠলো,
_কিছুই না।ওড়না ভাঁজ করে রেখেছি হাতের মুঠোয়।
এশা ঈশার উত্তর পেয়ে খানিকটা সময় আড় চোখে তাকালো ঈশার হাতের দিকে।তারপর নাক ফুলিয়ে বললো,
_সংয়ের মতো না দাঁড়িয়ে থেকে সবার খাবার বাড়।বাবা আসতেছে সবাই একসাথে খাব।
ঈশা মাথাটা দুলিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে নিজের রুমে চলে আসলো।রুমে আসতেই দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললো।ভাগ্যিস এশা ঔষধের প্যাকেটটা দেখেনি।তাহলে এ নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন করে বসতো।কে ঔষধ দিয়েছে,কেনই বা দিয়েছে,এসব প্রশ্ন করেও ক্ষান্ত হতো না আবার সালেহাকে ডেকেও ঔষধের প্যাকেট দেখাতে।এ নিয়ে মোটামোটি ছোটখাটো একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেত এই বাড়িতে।এই ভয়েই এতক্ষণ যেন নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয় ছিলো।
_তুই কী করিস দরজা বন্ধ করে তোকে একটা কাজের কথা বলেছি।ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলিনি।
এশার কথায় হুঁশ ফিরলো ঈশার।তাড়াতাড়ি করে টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে ঔষধের প্যাকেটটা সেখানে রেখেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো নিজের রুম ছেড়ে।এরপর পা বাড়ালো রান্নাঘরে।

সবার খাওয়া শেষ হতেই অল্প কিছু ভাত তুলে  নিলো প্লেটে।মুখে একটুও রুচি লাগছে না।খাবারের গন্ধেই কেমন সহ্য হচ্ছে না। বেশ কয়েকদিন ধরেই এমন অরুচি লেগে গেছে।ব্যাপারটায় খুব একটা পাত্তা দিলো না ঈশা। ভেবেছে সেরে যাবে।যার ফলশ্রুতিতেই এভাবে জ্বরটা ঝেকে বসলো।তখনই গায়ে গায়ে জ্বর ছিলো।কিন্তু এই অল্পবয়সী মন সেটা বুঝে উঠতে পারলো না।প্লেটের মাঝে হাতের আঙুল দিয়ে বিভিন্ন আঁকিবুঁকি করতে লাগলো।এক লোকমা ভাতও গলা দিয়ে নামছে না।সহসাই একটা নাম এঁকে বসলো ভাতের প্লেটের মধ্যে। ঈশা খানিকটা সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রইলো ভাতের প্লেটের দিকে।এই নামটা সে কেন লিখলো!নিজের মনকে প্রশ্ন করতেই বুকটা ধক করে উঠলো।মৃদুমন্দ এক ঝড় বইতে লাগলো বুকের মধ্যে। আর খাওয়া হয়ে উঠলো না।পানি ঢেলে হাতটা ধুয়ে নিলো।ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে এগুলো নিজের রুমের দিকে।ড্রয়ার থেকে ঔষধগুলো নিয়ে খেয়ে এসে নিজের বিছানায় বসলো।তখনই মনে পরলো ঈশানের দেওয়া সেই গিফটের কথা।এতক্ষণে বেমালুম ভুলে গিয়েছে।তাড়াহুড়ো করে বালিশের নিচ থেকে প্যাকেটটা বের করে নিলো।কী আছে এই প্যাকেটে ভেবে পাচ্ছে না।এসব ভাবতে ভাবতেই প্যাকেটটা ছিড়ে ফেললো।তখনই গুর গুর করে দশটা চকচকে পাঁচশত টাকার নোট ঈশার সামনে পরলো।বেশখানিকটা চমকে তাকিয়ে রইলো টাকা গুলোর দিকে।ঈশান হঠাৎ করে কেনই বা টাকা গুলো দিলো বুঝে উঠতে পারছে না।সহসাই নজর পরলো সাদা চার ভাঁজ করা একটা ছোট্ট কাগজের দিকে।তাড়াহুড়ো করে কাগজটা তুলে নিয়ে চোখ বুলাতে লাগলো কাগজের লিখাগুলোতে,

“ভেবো না এই টাকা গুলো আমি তোমাকে দিচ্ছি।এই টাকা গুলো তোমার নিজেরই পারিশ্রমিক।”
কোনভাবেই হিসেব মেলাতে পারলো না ঈশা।তার নিজের পারিশ্রমিক কথার মানেটা কিছুতেই মাথায় ঢুকলো না।সে তো এমন কোন কাজই করে নাই তবুও ঈশান কেন বললো, এগুলো তার টাকা।ভাবতে ভাবতেই আবারও তাকালো কাগজটার দিকে।
“শোন কাল কিন্তু কলেজে আসা বাদ দিবে না সামনেই সাময়িক এক্সাম শুরু।তার কিছু নোটস দিব।মনে থাকে যেন।আমি অপেক্ষায় থাকবো।” চিঠিটা পড়েই ভাঁজ করে একটা বইর মাঝে রেখে দিলো।কিন্তু টাকা গুলোর ব্যাপারটা তখনও মাথায় ঘুরছে।অতর্কিতে একটা খটকা বাঁধলো ঈশার মনে।এটা কোন টোপ নয়…তো ওকে নিজের ফাঁদে ফালানোর।কতদিনেরই বা পরিচয় ঈশানের সাথে।আগ বাড়িয়ে এত সাহায্য করা, কেয়ার করা, সবসময় খোঁজ-খবর নেওয়া ব্যাপারগুলো সত্যিই ভাববার বিষয়।আজকালকার যুগে কেউ লাভ ছাড়া কারো উপকার করে না।এক টাকার উপকার করলে দুই টাকা কেড়ে নেওয়ার জন্য বসে থাকে।ঈশানও কী ওর রুপের মোহে মোহিত হয়ে এসব করছে না তার কী গ্যারান্টি আছে?আর এভাবে গায়ে পরে উপকার করাটা সত্যিই হজম করা যাচ্ছে না।যদি ঈশান এসব লোভ দিয়ে টোপ ফেলে থাকে তবে কখনোই ঈশা ঈশানকে ক্ষমা করবে না।আর ঈশা মোটেও আর দশটা লোভী মেয়েদের মত নয়।মা না থাকলেও যথেষ্ট আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছে সে।আর কেউ যদি এই কয়টা টাকা দিয়ে তার বশে করে নিতে চায়,তবে সেটা তার ভুল ধারণা।সবাইকে একরমক ভাবাও এক ধরণের বোকামি।এসব ভাবেই মনটা বিষন্নতায় ছেঁয়ে গেল।একরাশ দুঃখ এসে মুহূর্তেই নিজের জায়গা করে নিলো ছোট্ট হৃদয়টাতে।চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার দিকে এগুলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রথম দেখা সেই নিষ্পাপ চোখ জোড়া চোখের সামনে ভাসাতে লাগলো।একে একে সবগুলো স্মৃতিচারণ করতে লাগলো।না…. কোথায় কোন খটকা বাঁধলো না।সবটাই গভীর নলকূপের পানির মতো স্বচ্ছ দেখতে লাগলো।তবে কি বেহুদাই এই ভয় এসে বাসা বাঁধলো ছোট্ট মনে!কোন ভাবেই সমীকরণটা মিলিয়ে উঠতে পারছে না।মুখে যদিও ঈশানকে দোষী বলে,কিন্তু মনটা কিছুতেই সে কথায় তাল মেলাতে পারছে না।ঘুরেফিরে সেই ঈশানের নামেই গুনগান গাইছে।মনের সাথে তাল মেলাতে না পেরে জানালা ছেড়ে এগুলো বিছানার দিকে।বাহিরে মৃদু বাতাস বইছে।জানালার সিক দিয়ে হিম শীতল বাতাস এসে গায়ে লাহছে খুব।বাতাসের ছোঁয়া পেতেই শরীরের লোমগুলো কাঁটা দিয়ে উঠছে।তাই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না।

_ভাইয়া জানিস ঈশা আপুর রুমটার অবস্থা তেমন ভাল না।
_আমি কখনো ওর রুমে যাই নি।
_উত্তর-পশ্চিম দিকে আড়াআড়ি করে একটা চৌকি পাতা।চৌকির পাশেই উত্তর দিকে পড়ার টেবিলটার সাথে একটা বহু পুরনো কাঠের চেয়ার। পশ্চিম দিকে দেয়ালের সাথে ঠেস দেওয়া একটা আলনা।পূর্ব পাশে দেয়ালের সাথে লাগানো একটা বড়সড় আয়না।আর কিছু নেই রুমটাতে।আর একটা এডজাস্ট বাথরুম।এই আছে। খুব খারাপ লাগলো দেখে।এমনি তে তো ঘরের পরিস্থিতি খুব একটা খারাপ না।কিন্তু ঈশার আপুর রুমেই কিছু নেই।তবে দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপু খুবই গোছালো।রুমটা খুব সুন্দর করে পরিপাটি করে রেখেছে।
_হুম। বেশিদিন ওকে ওখানে রাখবো না।
ঈশানের ঘোর লাগা কথায় মিলি খানিকটা চমকে তাকালো ঈশানের দিকে,
_মানে?
_কিছু না।বহুত পড়া হয়েছে।এবার নিজের রুমে যা।আমি এখন ঘুমাবো।কালকে Conditional sentence বুঝিয়ে দেব।

মিলিও কিছু একটা আঁচ করতে পারলেও পাল্টা প্রশ্ন করলো না।কারণ ঈশান কথাগুলো শোনার সাথে সাথেই কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।

চলবে,,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777