খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১৭


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

আজ মনটা প্রচন্ড অস্থির অস্থির লাগছে ঈশার।মনে হয় কাছের কোন জিনিস হারিয়ে গেছে।চাইলেও বোধহয় সেই জিনিসটাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।হ্যাঁ… তো ঈশান তো সহজেই কাছের কেউ হয়েছিলো।সেই কাছের বন্ধুটাকেই আজ অপমান করে নিজের থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ঈশা।সেই থেকেই অস্থিরতায় ভুগছে।দুইটা ক্লাস করার পর মনটা আর ক্লাসে বসিয়ে রাখতে পারলো না।ঘুরে ফিরে ঈশানকে করা অপমানগুলো কানে ঝনঝন করে ঝুনঝুনির মতো বাজতে লাগলো।খুব বেশি খালি খালি লাগছে হৃদয়টা আজ।

আজ এই ব্যাপার গুলোতে সব থেকে বেশি খুশি হয়েছে মীরা।কলেজের প্রথম দিন থেকে ঈশাকে তার খুব অসহ্য লাগে।আজ ঈশান আর ওর মধ্যে কথা কাটাকাটির শুরু থেকে শেষ অব্দি ক্লাসে বসে সবটা পর্যবেক্ষণ করেছে মীরা।সে নিজেই অনেকভাবে ট্রাই করেছিলো এই রিলেশনটা ভেঙে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছিলো না।ঈশান ভুলেও ওর গা ঘেঁষতে দিতো না মীরাকে।মীরা বিভিন্ন অজুহাতে ঈশানের কাছে ঘেঁষতে চাইতো।ঈশানও কম যায় না।পাল্টা একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে মীরাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত।কিন্তু আজ এভাবে মেঘ না চাইতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হবে অতটাও ভাবতে পারেনি মীরা।খুশিতে সে আত্মহারা।যে করেই হোক এই সুযোগে ঈশানকে নিজের বসে আনতেই হবে।যখন কারো সাথে খুব বিরোধ দেখা দেয় তখন তৃতীয় পক্ষের কেউ যদি ভেতরে এসে অন্য জনের নামে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে তাহলে মনটা খুব সহজেই বিষিয়ে যায়।তবে কী ঈশানের মনটাও এভাবেই বিষিয়ে যাবে?

“কথা হবে দেখা হবে,প্রেমে প্রেমে মেলা হবে
কাছে আসাআসি আর হবে না।
শত রাত জাগা হবে,থালে ভাত জমা রবে,
খাওয়া-দাওয়া কিছু মজা হবে না।
হুট করে ফিরে এসে লুট করে নিয়ে যাবে
এই ভেঙে যাবে জানো না।
আমার এই বাজে স্বভাব কোন দিন যাবে না”।

আজ যেন এই গানটা খুব বিরক্তিকর লাগছে।গানের প্রতিটা টন শুনলে আগে স্বাচ্ছন্দ্যে মনটা ভরে উঠতো।আজ সেই টনে ভেতরটায় প্রচন্ডভাবে কাঁপছে।কিছুতেই আজ প্রিয় গানটা শুনেও মনটা হালকা করতে পারছে না ঈশান।গানের মাঝে ঈশার বলা কথা গুলোও কানে লাগছে খুব।আজ চঞ্চল মনটা খুব বেশি অশান্ত হয়ে পরেছে।সব শুন্য লাগছে।রিক্ততা পুরো মনটা বিষিয়ে দিয়ে গেছে।সেই সকাল থেকেই এক রকম অস্থিরতায় কাটছে।কেন ঈশা এভাবে এত গুলো কথা শুনিয়ে দিলো।তার তো এমন কোন চিন্তাই নেই মনের আশেপাশে।তবে এটা ঠিক মনের ভেতরটায় ঈশা নামটা আটকা পরে গেছে।চাইলেও কী এত সহজে নামটা মুছে ফেলা যায় নাকি!সেই তো প্রথম কারো একরাশ ভয় জোড়া চোখের দিকে আটকা পড়ে গিয়ে ছিলো নিজের চোখ জোড়া।সেই থেকেই যে নামটা লিখা হয়ে গেছে ভেতরটায়। সেটার টের পাওয়া গেল বেশ খানিকটা সময় পেরুবার পর।তবে সেই নাম লিখাটা কী খুব বেশিই দোষের হয়ে গেল?এটাতে কী সত্যিই দোষের কিছু আছে যে,এত গুলো অপবাদ মাথা পেতে নিতে হলো।না কোন ভাবেই মনটাকে বুঝ দিতে পারছে না।সব গুলিয়ে একখানে এসেই জমা হচ্ছে। কেন ঈশা তাকে এমন ভুল বুঝলো!ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো খানিকটা সময়।হাতটা উপরে তুলে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলার আগেই কেউ একজন হাতটা স্ব জোড়ে ধরে ফেললো।

–ভাইয়া কী করছিস তুই?কী হয়েছে তোর?সেই কলেজ থেকে আসার পর থেকেই তোকে খুব ডিস্টার্ব দেখাচ্ছে। (মিলি)
ঈশান বেলকুনি ছেড়ে এসে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো।আর চিন্তা করতে পারছে না।মাথার মধ্যে মৃদু যন্ত্রণা ক্রমে গাঢ় যন্ত্রণায় রুপ নিচ্ছে।মিলি এসে পাশে বসলো।পিঠে হাত বুলিয়ে বললো,
–ভাই কী হয়েছে রে তোর?তোকে এভাবে দেখতে একটুও ভাল লাগছে না।
–একটা কাজ করবি আমার?
–কী?
–চুল গুলো একটু টেনে দিবি।যন্ত্রণা করছে খুব।
–তুই শুয়ে পর।
ঈশান বিছানায় পা উঠিয়ে কপলে একটা হাত রেখে শুয়ে পরলো।মিলি আলতো করে চুল গুলো টেনে দিচ্ছে ঈশানের।না চাইতেও সারাদিনের ক্লান্তিতে আর এতশত চিন্তার অবসান ঘটে চোখ জোড়াতে ঘুম নেমে আসলো।মিলি অনেকক্ষণ এভাবে চুলে হাত বুলানোর পর উঠে গিয়ে ঠাণ্ডা তেল এনে মাথায় দিয়ে দিলো।ঈশান যেন শান্তির ঘুমে বিভোর।তবুও ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় এখনো পুরো মুখটায় চিন্তার রেশ আর বিষাধময়তার ছাপ স্পষ্ট।
মিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশানের গায়ে কম্বলটা টেনে দিয়ে বেড়িয়ে গেল।

–কিরে ঈশান কই? ওকে ডাক। দুপুরেও ছেলেটা কিচ্ছু খায়নি।(রেহানা)
–বড় মা ভাইয়া ঘুমিয়ে পড়েছে।এখন ডাকলেও উঠবে না।আর না ডাকাই বোধহয় ভাল।ভাইয়ার মাথা ব্যথা কর ছিলো।এখন একটু ঘুমোলে হালকা লাগবে।এই কাঁচা ঘুম থেকে জাগালে মাথাব্যথা বাড়তে পারে।
–উফ এই ছেলেকে নিয়ে আর পারি না।এমনিতেই কত চিকন তার পরেও খাওয়া-দাওয়ার প্রতি এত অনীহা কেন বুঝিনা।
–ভাবি ঈশানকে আজ কোন বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিলো।খেয়াল করেছো মুখটা কেমন শুকনো লাগছিলো আজ।(রাবেয়া)
–হুম দেখেছি।কী নিয়ে এত চিন্তা করবে বুঝতে পারছি না।
–আচ্ছা তোমরা এখন খেয়ে ওঠ তো।ভাইয়া যদি রাতে জাগে আমি খাবার দিয়ে দেব।আমার পড়া আছে।তাই অনেকক্ষণ জাগতে হবে।
–মিলি তুই কী কিছু জানিস?
–না বড় মা।ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম।তেমন কিছুই বললো না।

কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক হচ্ছে না আজ।স্থির দৃষ্টিতে খানিকটা সময় তাকিয়ে থাকলো মাথার ওপর স্থির হয়ে ঝুলন্ত ফ্যানটার দিকে।সত্যিই কী ঈশান অত খারাপ ছেলে!এত গুলো কথা না শুনালেই কী হচ্ছিলো না।এখনও কানে বাজছে রবির বলা সেই কথা গুলো,
“এভাবে না বললেও পারতে।ঈশান শুধু তোমার বেলাতেই নয় ও যখন ক্লাস টেনে ছিলো তখন আমাদের এক ক্লাসমেট ফরম পিলাপের টাকা জমা দিতে পার ছিলো না।ঈশান ওকে এইভাবেই সাহায্য করে ছিলো।কিন্তু করুণা করে নি।ওর মনটা খুবই নরম।খুব কোমল হৃদয়ের মানুষ ও।তুমি ওকে এইভাবে হার্ট না করলেও পারতে।আর শেষ পর্যন্ত এত জঘন্য কথাটা বোধহয় বলাটা মোটেও উচিত হয়নি তোমার!ও বড়লোক ঘরের ছেলে হতে পারে কিন্তু মোটেও আর দশটা বড় লোক ঘরের ছেলেদের মত ওর স্বভাব-চরিত্র না।সেই তুমি ওকে একেবারে নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছো।এটা কী সত্যিই ওর প্রাপ্য ছিলো?
রবির কথার প্রতিত্তোরে একটা কথাও মুখ থেকে বের হলো না ঈশার।শুধু হা-পা গুলো অসম্ভব রকম কাঁপছিলো।আর মৃদুভাবে উষ্ণ  নোনা জল গড়িয়ে পরছিলো।”

বালিসের এপাস-ওপাস করতে লাগলো ঈশা।ঘুম যেন আজ পালিয়েছে। সহসাই সালেহার ঘর থেকে চিৎকার-চেচামেচির আওয়াজ কানে ভেসে আসলো।ঈশা গা থেকে কম্বলটা সরিয়ে এক রকম দৌঁড়ে সালেহার ঘরে গেল।

–কী হয়েছে মা?এমন চিৎকার করছো কেন?
ঈশার যেন কথাটা জিজ্ঞেস করে বড়সড় কোন দোষ করে ফেলেছি।ওমনি সালেহা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,

–আমার আলমারি থেকে টাকা চুরি করে এখন আবার সাধু গিরি দেখাতে আসছিস।
ঈশা সালেহার কথায় যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।কোন কথাই মুখ থেকে বের হচ্ছে না।কলেজের ওই ব্যাপারটায় পর থেকে এই ষড়যন্ত্রের কথা বেমালুম ভুলে গেল।সকালে যে ওমর সাবধান করে দিয়েছিলো সেটাও মাথায় নেই।মাথা তো একটাই! এক মাথায় কত চিন্তা ধারণ করা যায়!ঈশা খানিকটা সময় চুপ থেকে হালকা কণ্ঠে বললো,
–মা কী বলছো তুমি?আমি কেন তোমার টাকা চুরি করতে যাব?
ওমনি সালেহা তেলে বেগুনে জলে উঠলো।বাজে মুখভঙ্গি করে বললো,
–বেশি তরপাবি না আমার কাছে।কী মনে হয় আমি ঘাসের মুখ দিয়া চলি?তুই টাকা চুরি করেছিস আর এখন আমার সামনে বসে তামাশা করছিস।
কথাগুলো বলেই এশাকে ডাকতে লাগলো সালেহা। এশাও সালেহার ডাক শুনে সালেহার ঘরে আসলো।
–মা ডাকছিলে কেন?
সালেহা চোখের ঈশারায় কিছু একটা বললো এশাকে।যেটা ঈশার চোখে এড়ালো না।
–তুই কী আমার আলমারি থেকে টাকা নিয়েছিস?
–মা কসম করে বলতে পারবো আমি।কোন টাকা নেইনি তোমার।
–এবার বল? এশা তো টাকা নেয়নি।তাহলে কে টাকা নিয়েছে?তুই ছাড়া আর কেউ টাকা নেওয়ার মত নেই।তোর বাবাও বইত্তে নাই।আর ওমরের এসব হাত টান স্বভান নাই।
–মা আমিও কসম কাটতে পারবো।আমি সত্যিই কোন টাকা নেই নি।(ঈশা)
–তোর ঘর চেক করলেই বোঝা যাবে,কে চোর আর কে শাউগার।(এশা)
–হ্যাঁ… করো চেক। কোন সমস্যা নাই আমার।

ঈশার ঘর খুঁজতে এসে সাড়ে তিন হাজার টাকা পাওয়া গেল।
–কিরে তুই বলে টাকা নিস নি?তাহলে এই সাড়ে তিন হাজার টাকা আসলো কোথা থেকে?(এশা)
–মা বিশ্বাস করো ও গুলি আমার টাকা।এত দিন যে কাজ করছিলাম সেই টাকা গুলো জমিয়ে ছিলাম এগুলো কোন চুরির টাকা না।
–হারামজাদি আমার ঘরে খাবি আর আমার ঘরের বান কাটবি এটা তো আমি বাঁইচ্যা থাকতে হইতে দিমু না।আইজই তোর এই বাড়িতে শেষ দিন।কথাগুলো শেষ করেই ঈশার চুলের মুঠি ধরে টেনে-হিঁচরে বাহিরে নিয়ে যেতে লাগলো।
ঈশা ব্যতিব্যস্ত হয়ে সালেহার পা ধরে বসলো।কেঁদে কেঁদে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো,
— মা তুমি এমনটা করো না। এত রাতে আমি কোথায় যাব।তুমি প্রয়োজনে টাকা গুলো নিয়ে নাও তবুও আমাকে বাড়ি থেকে বের করো না।মা এই অন্ধকারে আমি কোথায় যাব?
–আমি তোকে এ বাড়িতে রাখবো সংসার তছনছ হয়ে যাওয়ার জন্য? আগেও এমন টাকা চুরি হইছিলো তখন আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই।এই বার চান্দু তুমি ধরা খাইছো আর এই বাড়িতে তোমার ঠায় নাই।
–মা তুমি যা বলবা আমি তাই করুম।তবুও তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিও না।আমি তো তোমারই মেয়ে।
–চুপ আর একটাও কথা না।তুই আমার মেয়ে হবি কোন কুলক্ষণে আমার মেয়ে এশা।তুই আমার সতীনের মেয়ে।
ঈশা মাটিতে বসে কাঁদছে আর কাকুতি-মিনতি করছে তবুও তার পাষণ মায়ের হৃদয় গললো না।মাটি থেকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরের বাহিরে বের করে দিলো।চিৎকার-চেচামেচির আওয়াজ শুনে ওমরের ঘুম ভেঙে গেল।ঈশার চিৎকারের আওয়াজ শুনেই কলিজাটা মোড় দিয়ে উঠলো ওমরের।এক লাফে বিছানা এগুলো ছেড়ে সদর দরজার দিকে ততক্ষণে ঈশাকে বাড়ির বাহিরে বের করে দিয়েছে সালেহা আর এশা।
–মা, আপু ঈশা আপু কোথায়?
–তুমি ঘুম থেকে উঠে এসেছিস কেন?(সালেহা)
–মা ঈশা আপু টাকা নেয়নি। টাকা আমি নিয়েছি।
সালেহা ভিষণ জোড়ে একটা ধমক দিলো ওমরকে।ওমর ভয়ে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।চোখ দিয়ে মৃদুভাবে উষ্ণ পানির ধারা বইছে।দরজার নিচ দিয়ে বোনটাকে একটি বার চোখের দেখা দেখার জন্য চোখ জোড়া হন্যে হয়ে খুঁজছে।কিন্তু না দরজা ভেদ করে তার দৃষ্টি বাহিরের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।সহসাই ওমর দৌঁড়ে এসে দরজাটা খুলে দিলো।ঈশা সিঁড়ির ওপর বসে কাঁদছিলো।ওমরকে দেখেই জেনো ভেতরের প্রাণের সঞ্চার হলো।উঠে এসে ওমরকে জড়িয়ে ধরে বাধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পরলো দু’জনে।এই দৃশ্য যে যে কারো চোখে জল এনে দিতে পারে অনায়াসে।কিন্তু এশা আর সালেহার এমন কিছুই হলো না।সালেহা বাহিরে গিয়ে ওমরকে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে ঘরে নিয়ে এসে ঈশার মুখের সামনে ধরাম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।

চলবে,,,,,,

Related Post

//whugesto.net/afu.php?zoneid=3060777