খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১৯


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

আনমনে রাস্তার পাশ ঘেঁষে হেঁটে চলেছে ঈশা।বুকটা প্রচন্ড ভার হয়ে আছে।মনে হচ্ছে কেউ কোনো ভারী পাথর দিয়ে চাপা দিয়ে দিছে বুকটার ওপর।নিঃশ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছে।মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে।ক্ষণিক বাদে বাদেই কান্নাটা চেপে বসছে খুব করে। নিজেকে কন্ট্রোল করাটা অস্বাভাবিক হয়ে পরছে।এভাবে রাস্তায় কান্না করলে কেউই ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখবে না।একেক জনের মনে একেকটা সন্দেহ বাড়তে থাকবে।হয়তো কেউ সন্দেহ দূর করতে কাছে এসে জিজ্ঞেসও করবে কেন কাঁদছো?যে প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই তার।বারবার হিজাবে চোখ মুছছে।এই মুহূর্তে কিছুতেই ওই দোজখ খানায় পা রাখতে মন চাইছে না।এমন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে যেখানে মন খুলে কাঁদতে পারবে।কখনো কখনো কাঁদলে মন অনেকটা হালকা হয়।একটু কাঁদার খুব প্রয়োজন এই মুহূর্তে। এখন বাড়িতে গেলে মনটা হালকা হওয়ার চেয়েও বেশি বিষিয়ে যাবে।না কোনভাবেই এখন বাসায় পা রাখা যাবে না।সহসাই মনে হলো ওর স্কুল লাইফের এক বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে ওদের এলাকাতেই।প্রায় মাস ছয়েক আগে বিয়ে হয়েছিলো।একবার হঠাৎ করেই রাস্তায় দেখা হয়ে যায় দুই বান্ধবীর।খুব করে সেদিন জোর করেছিলো সেই বাসায় যাওয়ার জন্য। তখন ঈশার কাজের চাপ ছিলো তাই চেয়েও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।আজ গেলে মন্দ হয় না।তাই মনটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে রওনা হলো বান্ধবীর বাড়ির উদ্দেশ্যে।

দরজা নক করতেই একটা হেংলা-পাতলা গড়নের মেয়ে এসে দরজা খুললো।বেনুনি করা চুলগুলো সামনের দিকে ঝুলে রয়েছে।চোখে গাঢ় কালো কাজলের রেখা দেখা যাচ্ছে। গায়ের রঙ শ্যামলা, উচ্চতা মিডিয়াম।পরনে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ।আর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো প্রশান্তির হাসি ঝুলে রয়েছে।সব মিলিয়ে কী সুশ্রী লাগছে মেয়েটাকে!ঈশাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো।
–কেমন আছিস তুই?
ঈশা মলিন কণ্ঠে জবাব দিলো,
–ভাল।তুই কেমন আছিস?
–ভাল।
–আর কেউ নেই বাসায়?
–না রে।ও অফিসে গেছে।আর মা(শাশুড়ি) গেছে আমার ছোট ননদের বাসায়।ছোট ননদের মেয়ে হয়েছে আজ চারদিন হলো।মা সেখানেই আছেন এই কয়দিন।
–ওহ্।
–আচ্ছা আয় ভেতরে আয়।আজ তোর সাথে মন খুলে কথা বলবো।কখনো ভাবিনি তোর সাথে আবার দেখা হবে।
ঈশা চুপ করে সোফায় বসে আছে আর সেতু বকবক করেই যাচ্ছে। ঈশা কথার ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু ম্লান হাসছে।যে হাসিতে কোনো প্রাণ নেই।এ হাসি যেন মৃত হাসি!

–বাবা তো তখন ট্রান্সফার হয়ে বরিশাল চলে যায়।আর সেখানের কলেজেই আবিরের সাথে দেখা।ও তখন মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে।একাউন্টিং নিয়ে পড়েছিলো।হঠাৎই ও একদিন আমাকে প্রোপোজ করে।আর আমিও সঙ্গে সঙ্গে প্রেমে পড়ে গেলাম।এট লাস্ট বিয়ে করে সোজা আবার ভোলাতে চলে এসেছি।
–সবাই মেনে নিয়েছে তো?
–মানবে না কেন?আবির কম কিসে?
ঈশা একটু ম্লান হেসে বললো,
–তুই খুব লাকি রে।নিজের ভালবাসার মানুষটাকে পেয়েছিস।এর থেকে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!
–হুম ঠিকই বলেছিস।আমি অনেক হ্যাপি। আমার শাশুড়ি মা তো অনেক ভাল।এমন শাশুড়ি আজকাল সবাই পায় না।একেবারে আমার মায়ের মতো।জানিস সবসময় মা আমার অনেক খেয়াল রাখে।আমি না খেতে চাইলে জোর করে নলা তুলে খাইয়ে দেয়।অনেক সুন্দর একটা ভালবাসার পরিবার পেয়েছি।মাঝে মাঝে নিজেকে পৃথিবীর খুব সুখী মানুষ মনে হয়।একদিকে আমার পরিবারের সবার ভালবাসা অন্যদিকে আবির আর মায়ের ভালবাসা।আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই আমার।
কথা গুলো শুনতে খুব ভাল লাগছে ঈশার।তবুও ভেতর থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসলো।ভালবাসার মানুষ বলতে যে তার কেউই নেই।যে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতো সেই একা রেখে দূর আকাশে পাড়ি জমিয়েছে।আর যে বাবা আছে সে থেকেও নেই তবে একজন আছে তাকে খুব ভালবাসে।সেই একটু ভালবাসার জন্যই বোধহয় এখনো ঈশা ওই বাড়িতে থাকতে পারছে।তবে সেই ভালবাসাটুকুও বারবার হেরে যাচ্ছে অন্য সবার ঘৃণার কাছে।তবে আর একজনও যে তাকে ভালবাসে!খুব ভালবাসে!যার চোখ-মুখের দিকে তাকালেই সেই ভালবাসাটুকু অনুভব করা যায়।যে ভালবাসায় কোন খাদ নেই।নিখাদ সেই ভালবাসা!তবে চাইলেও যে সেই ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার সাহস নেই তার।তার ভালবাসায় সাড়া দেওয়া যে কিছুতেই সম্ভব নয়।সেতুর কথায় ঘোর কাটলো ঈশার।
–অনেক বকবক করলাম। তুই বস আমি কিছু নিয়ে আসছি।একসাথে খাব আর কথা বলবো।
–সেতু যাস না।কথাই বলতে ভাল লাগছে।কিছু খাব না আমি।এদিকে এসে বস।
–তুই বস এখানে আমি যাব আর আসবো।
একটু বাদেই এক ট্রে ভর্তি নাস্তা নিয়ে এলো সেতু।এত নাস্তা দেখে ঈশার চোখ চরকগাছ।
–কিরে এত কিছু কীভাবে করলি?
–এগুলি আগেই গুছিয়ে রেখেছি করবো বলে।আমার ওনার আবার বউয়ের হাতের এসব ভাজা-ভুজি খাওয়ার শখ হয়েছে।
–খুব ভাল আছিস তাই না?
সেতু এক গাল হেসে বললো,
–আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভাল আছি আমি।
আচ্ছা এখন কথা নেই।আগে খেয়ে নে।সকাল থেকে তো মনে হয় কিছুই খাসনি।
ঈশা সেতুর কথায় শুধু একটু হাসলো।
দু’জনে মিলে চুপচাপ খেতে লাগলো।ঈশার যেন খাবারগুলো গলা দিয়ে নামছে না।কিন্তু সেতুর জোড়াজুড়িতে না খেয়েও পারছে না।ঈশানের বলা সেই কথাটা বারবার কানে আওয়াজ তুলছে
“ভালবাসি তোমায়…ঈশা।”
কথাটা যত বারই মনে পরছে ততবারই বুকের ভেতর মৃদু কম্পন হচ্ছে।
–ঈশা কী হয়েছে রে তোর?
খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল ঈশা।পরক্ষনেই নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে বললো,
–কই…কিছুই তো হয়নি।
–তুই কিছু একটা লুকোচ্ছিস।তোর চোখ-মুখ বলে দিচ্ছে তোর কিছু একটা হয়েছে।
ঈশা কোনভাবেই সেতুকে কিছু জানতে দিতে চাইছে না।কী দরকার নিজের দুঃখের কথা গুলো বলে অযথা এই সুন্দর সময়টাকে নষ্ট করে দেওয়ার। বেশ ভালই তো লাগছে সেতুর কথাগুলো শুনতে।সেখানে নিজের দুঃখের কথাগুলো বড্ড বেমানান।সেগুলো না বলাই ভাল।এই দুঃখের ভার কাউকে দেবে না সে।যদিও এসেছিলো সব কথাগুলো বলে মনটা হালকা করতে।কিন্তু এখন মন সেটা চাইছে না।
–সেতু এবার উঠি রে।অনেক সময় হয়ে গেছে।
–উঠি মানে?দুপুরে খেয়ে-দেয়ে তবেই যাবি।তার আগে এক পা’ও বাহিরে রাখবি না।
–কী বলিস এসব?পাগল হয়েছিস।বাসায় সবাই চিন্তা করবে
সেতু একটা ফিকে হাসি দিয়ে বললো,
–তোর জন্য চিন্তা করার মতো কেউ আছে মনে হয়?
কিছুটা চমকে তাকালো ঈশা।
–চমকানোর কী আছে?তোর কী আমাকে এতটাই অবুঝ মনে হয় ঈশা?
ঈশা মাথা নিচু করে বসে রইলো।সহসাই চোখজোড়া ভিজে উঠলো।সেতু এগিয়ে এসে ঈশার পাশে বসলো।ঈশার মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো।ঈশাও যেন একটা ভরসার কাঁধ পেল।যেখানে মন খুলে কাঁদতে পারবে।

–দেখেছিস এখনো বাড়িতে পা রাখেনি।নির্ঘাত ওই পোলার লগে ফস্টিনস্টি করতাছে।(সালোহ)
–ঠিকই বলছো মা।সেই সকালে গেছে কলেজে অথচ এখনো বাড়িতে আসার নাম নেই একটু বাদেই সন্ধ্যা নেমে আসবে।মা তোমার ওই প্ল্যানের কী খবর?
–খবর তো ভালই।যা হওয়ার আইজই হইবো।খালি এহন ওর বাড়ি আওন দরকার।নয়তো সব কিছু ভেস্তে যাইবো।

গোধূলি লগ্ন পেরিয়ে গেছে।চারদিকে আবছায়া অন্ধকার নেমে এসেছে। গাছপালা গুলো যেন নিস্তেজ হয়ে পরেছে। একটা গাছের পাতাও নড়ছে না।এই সময়ে প্রকৃতি যেন সম্পূর্ণ নিরব
হয়ে যায়।মনে হয় গাছেরা ঘুমাচ্ছে।সত্যিই কী গাছেরা ঘুমায়! হয়তো হ্যাঁ… হয়তো না।এই নিরব প্রকৃতির মাঝে একজন মানবী ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে তার গন্তব্যে।মনটা কিছুতেই সামনে এগুতে চাইছে না।শুধু পা’দুটো আর শরীরটা চলছে।পেছন থেকে যেন কেউ বারবার বারণ করছে সামনে না এগুতে।তবুও পেছনে ফেরার মতো কোন সাহস নেই তার।শত কষ্ট হলেও তাকে সেই ঠিকানায় ফিরতেই হবে।

বাড়ির কাছে আসতেই ওমরের দেখা মিললো।ওমর এক রকম দৌঁড়ে আসলো ঈশার কাছে।তাড়াহুড়ো করে বলতে শুরু করলো,
–আপু তুই বাসায় যাস না।তোর জন্য মা আর এশা আপু ভয়ংকর প্ল্যান সাজিয়ে রেখেছে।তুই এখনি পালা।নয়তো তোকে কেউ আজ এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না।
–কী বলছিস তুই এসব?
–ঠিকই বলছি।তুই তো সকালে চেয়ারম্যানের কথা বলছিস মা’কে। মা রাগে চেয়ারম্যানের ছেলে সোহাগকে কেন যেন বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসেছে।তুই তো জানিস ওই ছেলে মোটেও সুবিধার না।মেয়েদের দেখলে কেমন হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকে।তুই তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালা।নয়তো সোহাগ ভাই তোর কী ক্ষতি করবে আমি জানি না।
ওমরের কথার মানে বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না ঈশাকে।সোহাগ এলাকার অত্যন্ত বাজে প্রকৃতির একটা ছেলে।এ পর্যন্ত কয়টা রেপ কেসে জেলে গিয়েছে তারও হিসেব নেই।প্রতিবারই তার বাবার টাকার জোরে জেল থেকেমুক্তি পেয়ে যায়।আবার শুরু হয়ে যায় তার কুকর্ম। তার ভয়ংকর চাহনি থেকে নিজেকে সবসময় বোরকা দ্বারা আবৃত্ত করে রাখতো।কখনো সোহাগ ঈশার মুখ পর্যন্ত দেখেনি।তার মা আর বোন যে কী ছক এঁকেছে সেটা বেশ ভালই বুঝতে পারছে।চিন্তায় মাথার রগ গুলো যেন ছিরে যাবে।ব্যথায় মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। কোথায় যাবে এখন সে?যাওয়ার তো কোন জায়গা নেই।কী করবে, না করবে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতে লাগলো।

খুব শিঘ্রই আসছে………কমু না

😜
😜
😜
😜

চলবে,,,,,,

Related Post

//stawhoph.com/afu.php?zoneid=3060777