খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ২


লেখাঃKhyrun Nesa Ripa

কলেজ থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেল মার্কেটে।তিনশত টাকা দিয়ে একটা কাঁধ ঝোলানো কলেজ ব্যাগ কিনলো।এখন তো আর বই হাতে করে কলেজে আসা সম্ভব নয়।সবাই এক স্টাইলে আসবে আর ও যদি খুব বেশিই ভিন্ন ভাবে আসে তাহলে তো সেটা দেখতেও দৃষ্টিকটু মনে হবে।আর এটা নিয়ে সবার সমালোচনার পাত্রি হবে।আজ যেই অস্বস্তিতে পড়েছে নেক্সট আর এমন অস্বস্তিতে পরতে চায় না ঈশা।দুইশো টাকা দিয়ে পছন্দসই একটা হিজাবও কিনলো।পুরনো হিজাবটার অনেকাংশে সুতো উঠে গেছে।পড়লেও নিজের কাছেই খারাপ লাগে। আর আজ সবাই যেভাবে ওকে দেখছিলো,ভেবেই নিজেরই লজ্জা লাগছে খুব।একটা বোরকা যে কিনবে সেই টাকাও হাতে নেই।অগত্যা ব্যাগ আর হিজাব কিনেই বাড়ির পথ ধরলো ঈশা।

বাসায় এসেই ঈশান শার্ট-প্যান্ট চেঞ্জ করে ডাকলো মিলিকে,
_মিলি, এই মিলি?
_কিরে এনেছিস?
_হু।এখন আমার টাকা দে।আমার একশো টাকা খরচ হয়েছে।
_হু দিমু তোর টাকা।একশো টাকা বোনের জন্য খরচ করবে তা না উল্টো আবার টাকা চাইছে।বলেই ভেংচি কেটে উপকরন গুলো নিয়ে পা বাড়ালো ভেতরের রুমে।
ঈশান বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখটা বন্ধ করলো।তখনি চোখের সামনে ভেসে উঠলো সাদা ধবধবে একটা ফর্সা মুখ।যার গাল দু’টো ভয়ে রক্তিম বর্ণ ধারন করে ছিলো।ঠোঁট দু’টোতে যেন রক্ত ঝরছিলো।আর চোখের চাহনিতে মাতাল করা দৃষ্টি!ঈশান তাড়াতাড়ি চোখটা খুলে ফেললো।বিছানার পাশে রাখা পানির গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুক পানি খেয়ে ঝিম ধরে বসে রইলো।কেন ওই মুখটা ভেসে উঠলো! মাথা থেকে সেসব চিন্তা বাদ দিয়ে এগুলো ডাইনিং টেবিলের দিকে।ক্ষুধায় পেটটা চো চো করছে।

ঈশা ঘরে পা রাখতেই দৌঁড়ে আসলো এশা।হাত থেকে শপিং ব্যাগ গুলো নিয়ে নিজেই খুলে দেখতে লাগলো।
_ওয়াও আপু তোর হিজাবটা তো সেই সুন্দর হইছে।
তখনি ওমর এশার হাত থেকে হিজাবটা টেনে নিয়ে বললো,
_আপু পছন্দ করেই তো এনেছে, তাই সুন্দর হইছে।সব ব্যাপারে তোর ছোকছোকানি বন্ধ কর।(ওমর)
ওমনি এশা ওমরকে থাপ্পড় দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। তখনই ঈশার আড়ালে লুকিয়ে পরলো ওমর।
_এশা কী করছিস তুই?ছোটদের গায়ে হাত তুলতে নেই।
_তোর লাই পেয়ে পেয়ে ও যখন না তখনই আমাকে এভাবে ইনসাল্ট করে কথা বলে।আমি কী ছোট যে,ও আমার সাথে এভাবে কথা বলবে?
_ওমর তোমার ভুল হয়েছে এক্ষুনি বড় আপুকে স্যরি বলে দাও(ঈশা)
_ওই পেত্নীকে আমি স্যরি বলবো না।ও সবসময় তোর জিনিসগুলো নিয়ে নেয়।যেটা খুবই খারাপ।(ওমর)
_ওমর এবার কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি।
_ওকে….. স্যরি।এবার হলো?বলেই রাগ করে চলে গেল।

বিকেলবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে রেস্ট নিচ্ছে ঈশা তখনই মহিন আসলো।
_ঈশাপু ঈশাপু তোকে মহিন চাচা ডাকছে!(ওমর)
_ঈশা বিছানা ছেড়ে এগুলো সামনের বারান্দায়।মহিনকে দেখেই সালাম দিল।
_ওয়ালাইকুমুস সালাম।শোন কাল একটা কাজ পেয়েছি।সকাল সকালই যেতে হবে।আরও চারজন যাবে।
_কোন জায়গায় যেতে হবে?
_ওই তো মুসলিম পাড়া,চৌধুরী বাড়িতে। মেলা বড়লোক তারা।আর খুব ভাল মানুষও ওনারা।
_ওহ্।আচ্ছা চাচা আমি কাল সকালেই রওনা হব।
_তুই এক কাজ করিস।যাওয়ার আগে আমার বাড়ি হয়ে যাস।তাহলে সবাই একসাথে যেতে পারবো।
_আচ্ছা।

মহিন চলে যেতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নিজের রুমে।মহিন একজন রঙের কন্টাকটার।কন্টাকে কাজ নিয়ে মানুষের বাড়ি রঙ করায়।আর যেই টাকা পায়,সেখান থেকে সিংহভাগ নিজে রাখে আর বাদ বাকিটা  যাদেরকে দিয়ে কাজ করানো হয় তাদের মাঝে ভাগ করে দেয়।আজ নিজেকে খুবই অসহায় লাগছে ঈশার।মাথার ওপর নিজের বাবা থাকা সত্ত্বেও আজ নিজেকেই কাজ করে পড়ালেখার খরচ চালাতে হচ্ছে।যে কাজ ছেলেরা করে আজ সে কাজ মেয়ে হয়ে নিজেকেই করতে হচ্ছে ঈশার!শুধুমাত্র পড়ালেখাটা চালানোর জন্য।আজ যদি ওর মা বেঁচে থাকতো কখনোই মেয়েকে দিয়ে এমন কাজ করতে দিতে না।গ্রামে একটা কথা আছে,
মা মরলে বাপ হয় তালই,আজ কথাটা সত্যিই মনে হচ্ছে ঈশার।মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে বাপটাও যেন পর হয়ে গেল!

ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠেই নামাজটা সেরে নিলো ঈশা।আজ অনেকদিন হয়ে গেছে কোরআন শরীফটা তেলওয়াত হয় না।আজ কোরআন শরীফ তেলওয়াত করলো।মনটা খুব ফুরফুরে লাগছে।আসলে আল্লাহর কাজ করলে মনটা এমনিতেই ভাল হয়ে যায়।দিনগুলিও খুব ভাল কাটে।ফুরফুরে মেজাজেই সকাল আর দুপুরের সমস্ত রান্না সেড়ে নিলো।অল্প কিছু খেয়েই বেড়িয়ে পরলো নিজের  কাজে।

আজ ঈশা যে, বাড়িতে কাজ করতে এসেছে সে বাড়ির সামনে এসেই হা হয়ে গেল।এর আগে এমন একটা বাড়িতেও কাজ করে নি।কুঁড়ি-পঁচিশ বিঘা জমি নিয়ে বিশাল বড় একটা বাড়ি।পুরো বাড়ির চত্তরটা বাউন্ডারিতে ঘেরা।বাড়ির সামনের দিকটায় পাথরের ওপর খোদাই করে লিখা – চৌধুরী নিবাস।দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহু আমলের পুরনো এই বাড়ি।বাউন্ডারির দেয়ালের রঙগুলো অনেক জায়গাতেই নেই।বাকলের মত উঠে পরে গেছে।সবার সাথে পা বাড়ালো বাড়ির ভেতরটায়।রাস্তার দু’ধারে পঞ্চাশটার মত নারকেল গাছ।প্রতিটা গাছে নারকেল ঝুলছে।তার পাশেই একটা বিশাল বড় ঘাটলা বাঁধানো পুকুর।রাজ হাঁস গুলো পুকুরের মধ্যে ডানা ঝাপটে সাঁতার কাটছে।কী মনোরোম দৃশ্য! চোখ জুড়িয়ে আসছে ঈশার।ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো একটা একতলার বাড়ি।বাড়িটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ পুরনো।তবে বাড়ির ডিজাইনটা বেশ নিপুণ হাতে তৈরী!ঘরটার মেইন দরজার মাঝামাঝি একটা বড়সড় সিড়ি।সিড়ির দু’পাশে দু’টো বেলকুনি।বেলকুনির একপাশের রসিতে টাঙানো ছেলেদের কাপড় ঝুলছে আর অন্য পাশে মেয়েদের।বোঝাই যাচ্ছে এই বাড়ির ছেলে মেয়েদের রুম এই দুইটা।দক্ষিন দিকের বেলকুনির সাথে লাগোয়া একটা সিড়ি,যেটা দিয়ে ছাঁদে ওঠা যায় অনায়াসে।আর ভেতরটা কেমন সেটা আর বাহির থেকে বোঝা গেল না।বাড়ির দক্ষিণ দিকটায় একটা টিউবওয়েল।তার এক পাশেই একটা হাঁস – মুরগির খোপ।আর উত্তর পাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফুল গাছে সুসজ্জিত!
এই বাড়িতে পা রাখতেই মনটা ভাল হয়ে গেল ঈশার।

_বড়মা, মা কোথায় গেলে তোমরা?এদিকে এসো?( ফিসফিসিয়ে ডাকলো মিলি)
মিলির ডাকে রেহানা, রাবেয়া একরকম দৌঁড়েই আসলো।
_কী রে? কী হয়েছে?(রেহানা)
_দেখ(মিলি)
রেহানা পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলো একটা মেয়ে শিশ কাগজ দিয়ে দেয়ালের পুরনো রঙগুলো ঘষে ঘষে তুলছে।কাঁধের উপর দিয়ে কোমরে ওড়নাটা গুঁজে দেওয়া।কোকড়া কোকড়া চুলগুলো ঝুটি করে বাধা মাথার উপরটায়।কোমর সমান চুলগুলো মেয়েটার কাজের সাথে পাল্লা দিয়ে নড়ছে।বেশ ভালই লাগছে চুলগুলো দেখতে।পায়ের গোড়ালি দু’টো ধবধবে সাদা।হাতগুলোও খুব সাদা।কাজ করার কারণে কেমন লাল টকটকে হয়ে গেছে।

_বড়মা জানো মেয়েটা কী যে সুন্দর!
_তুই কিভাবে দেখলি?মেয়েটা তো সামনের দিকে তাকানো।(রাবেয়া)
_আরেহ যখন বোরকা খুলছিল তখন দেখছিলাম।এমন সাদা মেয়ে শুধু ইংরেজদেরকেই দেখেছি আর যাদের ধবল রোগ হয় তাদের দেখতে এই রকম। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখতে ধবধবে ফর্সা হলেও অনেক সুন্দর।মনে হয় ঠোঁট গুলো দিয়ে রক্ত ঝড়বে।রক্ত জবার মত লাল ঠোঁট দু’টো।আর গাল দু’টো তো গোলাপের পাঁপড়ির মত দেখতে!আমি জাস্ট ফিদা হয়ে গেছি মা।এত সুন্দর মেয়ে আমি জীবনেও দেখিনি।
_মেয়েটাকে একটু ডাক দে তো, দেখি।(রেহানা)
_এই যে,আপু?(মিলি)
_মিলির ডাকে পেছন ফিরতেই তিনজন মহিলাকে দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গেল ঈশা।কোনরকম একটা হাসি ঠোঁটের কোণে রেখে ওদের সবাইকে সাালম জানালো।
_ওয়ালাইকুমুস সালাম।তোমরা কয়জন কাজ করতে এসেছো?(রেহানা)
_আমরা পাঁচজন এসেছি(ঈশা)
_ওহ্… আচ্চা।(রেহানা)
_তোমার নাম কী?(রাবেয়া)
_ইশতিয়া জাহান ঈশা!
_বাহ্! অনেক সুন্দর নাম তো তোমার?(মিলি)
_ধন্যবাদ।

ঈশার সাথে অল্পস্বল্প কথা বলেই সবাই চলে গেল ভেতরের রুমে।
-মা দেখেছো বলেছিলাম না কত সুন্দর মেয়েটা!
_হুম ঠিকই বলেছিস। অনেক সুন্দর। কিন্তু মেয়ে হয়ে কিভাবে রঙের কাজ করবে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।আর মেয়েটার ফ্যামিলিই বা কেমন!এই মেয়েকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে?(রাবেয়া)
_বুঝলি ছোট!দুনিয়ার পরিস্থিতি বোঝা ভার!হয়তো কোন ফ্যামিলি সমস্যা। তাই মেয়েটা কাজ করছে।(রেহানা)
_কিন্তু তাই বলে এই কাজ করতে হবে কেন?অন্য কাজও তো করতে পারতো?(রাবেয়া)
_হয়তো পায়নি অন্য কাজ।আর এই যুগে তো মামুর জোড় লাগে কাজ পেতে গেলে।যোগ্যতা দেখে তো এখন আর কাউকে কাজ দেওয়া হয় না।মেয়েটা কত সুন্দর। আমার এমন একটা মেয়ে থাকলে আমি মাথায় করে রাখতাম।(রেহানা)
_বা রে আমি বুঝি তোমার মেয়ে না?(মিলি গাল ফুলিয়ে বললো)
_হ্যাঁ… তো আপনি আমার দস্যি মেয়ে।(রেহানা)
রেহানার কথা শুনে রাবেয়া বেশ জোড়েই হেসে দিল।আর মিলি রাগ দেখিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

চলবে,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777