খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ৪


লেখাঃKhayrun Nesa Ripa

কাজ শেষ হয়ে বাড়ির পথ ধরতেই ঈশার হাতের মুঠে পাঁচশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিলো মহিন।সারাদিন খাটাখাটুনির পর পারশ্রমিক পেয়ে চোখেমুখে হাসির আভা ফুটে উঠলো ঈশার।মনটাও ভিষণ রকমের ভাল হয়ে গেল।ভাগ্যিস মহিন চাচার খোঁজ পেয়েছিল।তার বদৌলতেই আজ পড়াশুনাটা চালিয়ে যেতে পারছে।নয়তো কী যে হত!ভেবেই একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইলো। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেল সামনের দোকানটায়।সেখান থেকে পাঁচটা ক্যাটবেরী চকলেট কিনলো ওমরের জন্য। ওমরটা চকলেট পেলে আর কিছু চাই না।সারাদিন মনে হয় চকলেট খেয়েই কাঁটিয়ে দতে পারবে।যখনই টাকা দিতে যাবে তখনই মহিন এসে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দোকানদারকে দিয়ে দিল।
_ওই পাঁচশো টাকা ভাঙাস না। রেখে দে, পরে কোন কাজে লাগবে।(মহিন)
ঈশার চোখে পানি চলে আসলো।মহিন নামের বাবার বয়সী এই লোকটা কত বোঝে ওকে।অথচ নিজের বাপটা একটুও বুঝলো না।কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠলো ঈশার।হাঁটতে হাঁটতে চৌধুরী বাড়ির বড় বউর কথা খুব মনে পরতে লাগলো ঈশার।আজ কত যত্ন করে সবাইকে খাইয়েছে রেহানা।কয়েক মুহূর্তের জন্য ঈশার রেহানাকে পরম কাছের কেউ মনে হয়েছিল।মা যেমন সন্তানের যত্ন নেয় রেহানাও ঠিক সেরকম করেছে।পারে না যেন,ঈশাকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়।আজ কতদিন পর বেশ তৃপ্তি সহকারে অনেকগুলো পদ দিয়ে দুপুরের ভাত খেয়েছে ঈশা।একটু বেশিই লজ্জা লাগছিলো খেতে।কিন্তু রেহানা যেভাবে জোর করলো না করারও কোন উপায় ছিলো না ঈশার।

আর মিলি মেয়েটা সারাক্ষণ কানের কাছে ননস্টপ বকবক করেই ছিলো।একটুও বোরিং লাগেনি ঈশার।বরং বেশ ভালই লেগেছে।খু্ঁচিয়ে খুঁচিয়ে এটা সেটা জিজ্ঞেস করেছে।এত বড় মেয়ে যে, এত কথা বলতে পারে জানা ছিল না ঈশার।ইশ… যদি এশাটা এমন হত তাহলে আর কিসের দুঃখ ছিল ঈশার।মনের কথাগুলো তো এশার কাছেও সেয়ার করা যেত।ভাবতে ভাবতেই বাড়ির কাছে এসে গেল।মহিন ঈশাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির পথ ধরলো।

_মিলি,এই মিলি(ঈশান)
_কিরে কী হয়েছে?(মিলি)
_ওরা আর কয়দিন কাজ করবে?
_আমি কী জানি?যেই বড় বাড়ি, এখনো মনে হয় দশ-পঁনের দিন লাগতে পারে।
_সত্যিইইই।অনেকটা এক্সাইটেড হয়ে কথাটা বললো ঈশান।
_তোর আবার এত খুশির কারণ কী?
ঈশান কোনরকমে ঠোঁটের কোণ থেকে হাসিটা লুকিয়ে বলল,
_আমি….আমি কেন খুশি হব?
_ভাই এত তোতলাচ্ছিস কেন?তোর হয়েছেটা কী?(চোখ মেরে বলল)
_এখান থেকে যা। আমি এখন পড়বো।তোর সাথে ফালতু কথা বলে টাইম নষ্ট করার সময় নেই আমার।
_বাহ্!মনে হয় আমি সেধে সেধে তোর সাথে কথা বলতে এসেছি?তুই ডেকেছিস তাই এসেছি।
_ভাল করেছেন কাজের বেটি মিলি।এবার নিজের কাজে যান।অযথা বকবক করে মাথা খায়েন না।
_হু…যাচ্ছি। এই কাজের বেটিকে আবার ডাকিয়েন তখন আর দেখবেন না।বলেই ভেংচি কাটে চলে গেল মিলি।

_যদি ও এতদিন কাজ করে তাহলে তো আর কলেজে যাবে না।উফ কী যে করি(মনে মনে বললো ঈশান)
পরক্ষনেই খুশিতে মনটা ভরে গেল ঈশানের।ঠিক করলো যতদিন ঈশা এখানে কাজ করবে ততদিন ও আর কলেজ যাবে না।আজ কলেজে যাওয়ার পরেও কেন যেন মনটা পড়েছিল বাড়িতেই।ওই জন্য একটা ক্লাস করেই বাড়িতে ফিরে আসে ঈশান।যতক্ষণ ঈশা বাসায় ছিল ততবারই এটা ওটার বাহানায় ঈশার কাছে গিয়েছিল।আড়াল থেকে মুগ্ধ হয়ে ঈশাকে দেখছিল।কিন্তু নিজের এই হঠাৎ পরিবর্তনে ঈশান নিজেই কনফিউজড। কেন সব কিছু, এমন এক দেখাতে পাল্টে গেল।এটাকে কী বলে ঈশানের জানা নেই।সেই ভয় কাতুরে লাল টুকটুকে মুখটা প্রথম দেখাতেই মনে দাগ কেটে রয়েছে।চোখটা বন্ধ করলেই সেই মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে।এই প্রথম কারো মুখের দিকে তাকিয়ে ঈশানের এমন ভ্রম লেগে গেছে যে, চাইলেও ভুলতে পারছে না।এমন নয় তো যে, এর আগে কোন মেয়ের ভয় পাওয়া মুখের দিকে ও তাকায়নি!তাহলে কেন এমন হচ্ছে ওর সাথে!নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে চলেছে ঈশান।

ঈশা বাড়িতে পা রাখতেই ওমর এসে বোনকে জড়িয়ে ধরলো।ঈশা ব্যাগ খুলে দু’টো চকলেট দিল ওমরকে।বাকিগুলো নিজের কাছেই রেখে দিল।কারণ এখন সবগুলো চকলেট দিলে সবগুলোই খেয়ে নেবে ওমর।এক সাথে বেশি চকলেট খাওয়া মোটেও ঠিক না।ভাইয়ের সাথে খুনসুঁটির পর্ব শেষ করে পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে।আজ গোসলটাও করা হয়নি।এখন খুব শীত লাগছে।তবুও গোসল না করে উপায় নেই।পুরো শরীর ধূলোতে মাখামাখি। রুমে এসে বোরকাটা খুলেই ওয়াশরুমে চলে গেল।মটারের এই ঠান্ডা পানিতেই শেষমেশ গোসলটা সারতে হলো ঈশার।

গোসল সেরেই এগুলো রান্নাঘরে।রাতের রান্নাবান্না সেরে সবাইকে খাইয়ে, নিজেও অল্পকিছু খেয়ে রুমে আসলো।ঈশা একাই থাকে ওর রুমে।এশা ওর সাথে ঘুমায় না।প্রতিটা রুমের সাথেই এডজাস্ট বাথরুম।তবে সবার থেকে নিম্নমানের রুমটাতেই থাকে ঈশা।কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর শুয়ে পরলো ঈশা।চোখটা বন্ধ করতেই মনে পরে গেল আজকের সেই দৃশ্যটা।প্রথম কোন ছেলের থেকে পাওয়া স্পর্শের কথা।এর আগে কখনো ঈশা কোন ছেলের সান্নিধ্যে যায়নি।এতটা কাছে কখনো কেউ আসেনি।ইশ…কী লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে আজ!ভেবেই মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো ঈশার।না চাইতেও বারবার ভিডিওর মত সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসতে লাগলো।

অন্যদিকে ঈশানের চোখেও ঘুম নেই।বারবারই ওই লাজে রাঙা মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে।এই শীতের মধ্যেও বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনছে আর মনে মনে হেসে উঠছে।ঈশান নিজেই ভেবে পাচ্চেনা ওর সাথে এসব কী হচ্ছে! সত্যিই আবার পাগল-টাগল হয়ে গেল না তো!সব ভাবনা একপাশে ফেলে আনমনে খালি গলায় গেয়ে উঠলো,
“ও আমার বন্ধু গো,
চিরসাথী পথ চলা।
তোমারি জন্য, গড়েছি আমি,
মঞ্জিল ভালবাসা!”

_বাহ্ বাহ্ অসাধারণ!এই রাত বিরাতে আপনার গান কে শুনছে শুনি(মিলি)
_তুই এখানে কেন?
_আপনার গান শুনিয়া মগ্ধ হইয়্যা চলিয়া আসলাম!
_বেশি বকবক না করে এখান থেকে ভাগ।
_ভাইয়া একটা কথা বলতে এসেছি।
_তোর কোন কথা শুনতে চাই না।এখন যা।অনেক রাত হয়েছে।
_রাত হয়েছো তো কী হয়েছে?আমি কী তোর সাথে প্রেম করতে আসছি নাকি?
_আচ্ছা ফাও প্যাচাল বাদ দিয়ে যা বলার বলে ফেল।
_আজ আমাদের বাসায় যে মেয়েটা কাজ করতে এসেছে তাকে দেখেছিস তুই?
_কোন মেয়েটা?
_ঢং করিস না।ঈশা আপু পড়ে যাচ্ছিলো তখন তো তুইই ধরলি।এখন আবার বাহানা করে জিজ্ঞেস  করা হচ্ছে কোন মেয়েটা!যত্তসব ঢং!
ঈশান মিলির এমন কথায় ইতস্তত করে বলল,
_ও মনে পরেছে।ওই মেয়েটা তাই না?কী যেন নাম?
মিলি ঈশানের সামনে এসে বললো,
_ইশশিরে তুই নামটা এভাবে ভুলে যাবি, আমি বুঝতেই পারিনি। (এক্টিংয়ের ছলে বললো)
_না বোঝার কী আছে?আমি কী ওকে চিনি নাকি যে,নাম জানবো।আর একবার শুনলে যে, নামটা মনে রাখতে হবে এমনও না।
_নামটা কিন্তু তোর সাথে বেশ মিলে।
_ওহ্ মনে পরেছে।নামটা বোধহয় ঈশা তাই না?
_ভাইয়া শোন না?
_বল….শুনছি।
_তোকে না এমন অভিনয়ের জন্য নোপেল দেওয়া উচিত!
_মানে?(কিছুটা ক্ষেপে গিয়ে)
_এই যে সুন্দর করে মিথ্যাটাও বলতে পারিস না।এত কাঁচা হলে হবে না।আর একটু এক্সপার্ট হতে হবে মিথ্যেটা সাজিয়ে-গুছিয়ে বলার জন্য।কথাগুলো বলেই ঈশা চলে গেল।আর ঈশান নিজের এই নির্বুদ্ধিতার জন্যই নিজেই একা একা হাসতে লাগলো।

প্লিজ কেউ কপি করবেন না।

চলবে,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777