খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ৫

লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

আজ প্রায় দশ দিনের মত ঈশা কাজ করছে।হয়তো কালই কাজ শেষ হয়ে যাবে।এই বাড়ির প্রতিটা মানুষের প্রতি কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে।মনে হয় কতশত আগের থেকে চেনা এই মানুষগুলো।এত সহজেই কেউ কারো সাথে মিশতে পারে জানা ছিলনা ঈশার।বিশেষ করে বড়লোকদের তো ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।সে দিক থেকে এই চৌধুরী বাড়ির সবাই খুবই আন্তরিক।কত মিশুকে এ বাড়ির মানুষগুলো।আর সবচেয়ে বেশি যাকে মনে পড়বে, সে হল মিলি।সারাক্ষণ ঈশার গা ঘেষেই থাকতো।কত যে কথা বলে মেয়েটা, বলেও শেষ করা যাবে না।এত কথা মাথায় কী করে আসে ভেবে পায় না ঈশা।

এসব ভাবতে ভাবতেই চৌধুরী বাড়িতে পা রাখলো।ও ঘরের ভেতরেই কাজ করে।আর বাহিরটায় অন্য ছেলেরা সামলায়।আজ ঈশার কাজ পরেছে দক্ষিণ পাশের সামনের রুমটায়।ঈশা ঘরের মধ্যে পা রাখতেই কেমন যেন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।মনে হয় আজ বাড়িতে কোন জনমানবের চিহ্ন নেই।ধীর পা ফেলে সামনে এগুতেই দেখা হয়ে গেল রেহানার সাথে।ঈশা রেহানাকে দেখেই মুচকি হেসে সালাম জানালো।
_আন্টি আজ বাসায় কি কেউ নেই?
_হ্যাঁ…ঠিকই বলেছো কেউ নেই।রাবেয়ার মায়ের অসুখ,তাই মিলি আর ওর মা দেখতে গেছে।মিলি না থাকলে বাড়িটা কেমন যেন হয়ে যায়।মনে হয় এই বাড়িতে কোন প্রাণ নেই।আর দেখো না ছেলেটা সেই রাতে শুয়েছে এখনো অব্দি উঠছে না।এই ছেলেকে নিয়ে আর পারি না কত করে ডাকলাম,উঠছেই না।সকাল দশটা বেজে গেছে অথচ এখনো কিচ্ছুটিও খাওয়া হয়নি।ওদিকে একা একা সমস্ত কাজ সামলাতে হচ্ছে। আজ কাজের মেয়েটাও আসলো না।বিপদ আসলে সবদিক দিয়েই আসে।কথা গুলো বলতে বলতেই রেহানা এগুলো রান্নাঘরের দিকে।
ঈশাও তার কাজে চলে গেল।ঈশানের রুমে ঢুকতেই দেখলো ঈশান একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।ঈশা যে কাজ করবে তাও পারছে না।কারণ কাজ শুরু করলে ধুলাবালি সব পরবে খাটের ওপর।কোন উপায়ান্তর না পেয়ে ঈশা মিহি গলায় ডাকতে লাগলো ঈশানকে।
_এই যে শুনছেন?
_নিশ্চুপ(ঈশান)
_আপনি এখন উঠুন….না।আমাকে কাজ করতে হবে।এভাবে শুয়ে থাকলে আমি কাজ করতে পারছি না।
_নিশ্চুপ
_আরেহ শুনছেন আপনি?
কিন্তু ঈশানের কোন রেসপন্স নাই।বাধ্য হয়ে ঈশা কম্বলটা আস্তে করে টেনে মুখের সামনে থেকে সরালো।দেখলো ঈশানের পুরো মুখটা লাল হয়ে গেছে।কেমন গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে।ঈশা আরও কয়েকবার ডাকলো কিন্তু কোন সাড়া দিল না ঈশান।অগত্যা নিজের হাতটা বাড়িয়ে নিলো ঈশানের কপালের কাছে।কপালের সাথে হাতটার ছোঁয়া লাগতেই ঈশা আৎকে উঠলো।জ্বরে গা পুরে যাচ্ছে।ঈশা দৌঁড়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে।আন্টি আন্টি বলে উৎকণ্ঠা হয়ে ডাকতে লাগলো রেহানাকে।রেহানাও ঈশার এমন ডাক শুনে একরকম ছুটে এল রান্নাঘর ছেড়ে।
_কী হয়েছে মা?
_আন্টি ওনার ভিষণ জ্বর!
_কার?
_আপনার ছেলের।
রেহানা কথাটা শুনেই দৌঁড়ে আসলো ঈশানের ঘরে।ঈশানের মাথায় হাত রাখতেই কেঁদে ফেললেন রেহানা।এই ছেলেকে নিয়ে খুব ভয় তার।সেই ছোট বেলার রোগের কথা মনে উঠলে এখনো কেঁদে ভাসান রেহান।আজ আবার এমন জ্বর দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল রেহানা।আল্লাহ না করুক যদি আবার কিছু হয়ে যায় তার ঈশানের!

ঈশা রেহানার এমন কান্না দেখে পুরাই হতভম্ব হয়ে গেছে।জ্বর হলে এভাবে কেউ কাঁদে এটা জানা ছিলো না ঈশার।এমন জ্বর তো ওর নিজেরও কত হয়েছে।ঔষধ খেয়েছে আবার সেড়ে গেছে।এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে সেটাই বুঝে পাচ্ছে না ঈশা।তবুও এগিয়ে এসে রেহানার পাশে বসলো।কোন রকম সান্ত্বনার স্বরে বলল,
_প্লিজ আন্টি আপনি কাঁদবেন না।জ্বর হয়েছে ঔষধ খেলেই আবার ঠিক হয়ে যাবে।
_মা তুমি জানো না।ওর যখনই জ্বর হয় তখনই ওকে একেবারে এই ভয়ংকর জ্বর শেষ করে দেয়।কেউ বাসায়ও নেই যে,এখন আমি ওকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যাব।একটু পানি দেওয়া দরকার মাথায়। অথচ চুলায় রান্না বসিয়েছি।কোনদিকে যে যাই এখন।এই ছেলে এত বড় হয়েছে তবুও আমাকে জ্বালিয়ে মারে।কাল বিকালে তুমি তো দেখছো, এই শীতের মধ্যে পুকুরে নেমে মাছ ধরেছে।কতবার বলেছি এসব করিস না, উঠে আয়।একবারও শুনলো না আমার কথা।এখন আবার জ্বর বাধিয়ে বসেছে।এই ছেলের সাথে আমি আর পারিনা।কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলে থামলো রেহানা।

খুব খারাপ লাগছে ঈশার।এত বড় ছেলের জ্বরে কী রকম করছে ওর মা।আর ওর জ্বর হলে সবকিছু নিজেকেই করতে হয়।এই জ্বরের শরীর নিয়েও সব কাজ সামলাতে হয়।সবাইকে খেতে দিতে হয়, রান্না করতে হয়।ভেবেই চোখের কোণে জল এসে গেল।পাশ ফিরে ওড়ানায় চোখের পানি মুছে ফেলল ঈশা,
_আন্টি আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি কী ওনার মাথায় পানি ঢালতে পারি?
_আমি কিছু মনে করবো না মা।তুমি এটুকু করলে আমার খুব উপকার হয়।দেখো একা হাতে কয়টা সামলাবো!
_আচ্ছা আপনি যান আমি সামলাচ্ছি।
_তুমি পারবে তো?
_হ্যাঁ….আন্টি পারবো।

রেহানা চলে যেতেই ঈশা এক বালতি পানি নিয়ে আসলো। ঈশানকে ভাল করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে মগ দিয়ে আস্তে আস্তে পানি ঢালতে লাগলো ঈশানের মাথায়।ক্ষণিক বাদে বাদে ঈশানের চুলের ফাঁকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ঈশা।এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা পানি দেওয়ার পর ঈশান চোখ পিটপিট করে তাকালো। ঈশাকে চোখের সামনে দেখেও মনে হচ্ছে এটা ঈশানের ভ্রম।
_ঈশা আর পানি দিও না তাহলে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে।এখন মাথাটা মুছিয়ে দাও ওর।
শরীরটা মুছে দিলেও একটু ভাল হতো।যেই তাপ শরীরে।(রেহানা)
_আচ্ছা আমি মাথাটা মুছিয়ে দিচ্ছি।
_তুমি মাথাটা মুছে দাও।আমি এসে শরীরটা মুছিয়ে দেব।বলেই আবার রান্নাঘরে ছুটলেন রেহানা।
ঈশা ঈশানের মাথাটা নিজের উরুর উপর নিয়ে তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মাথাটা মুছে দিল।ঈশানের মাথাটা বালিশের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াতে যবে, তখনই ঈাশান ঈশার হাতটা ধরে ফেলল।প্লিজ যেও না।
ঈশা দেখলো উত্তাপহীন এক জোড়া শীতল চোখ তার দিকে আকুতি ভরা আবেদন নিয়ে তাকিয়ে আছে।কেন যেন বুকটার মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠলো ঈশার।এই ডাক অগ্রাহ্য করে চলে যাওয়ার সাধ্য যেন কারো নেই।ঈশা আবার আগের জায়গায় বসে পড়লো।আলতো করে হাত চালাতে লাগলো ঈশানের চুলে।আর ঈশান ঈশার একটা হাত নিজের মুঠোয় বন্দী করে চোখ বুঝে রয়েছে।প্রায় অনেকক্ষণ এভাবে থাকার পরেও যখন দেখলো রেহানা আসছে না।তখন ঈশা নিজেই ঈশানের গায়ের শার্ট খুলতে লাগলো।ঈশানের শ্যামবর্নের লোমশ বুকটা দেখে বড্ড বেশিই লজ্জা লাগছে ঈশার।অজানা এক শিহরনে বারবার শিহরিত হয়ে উঠছে।নিজের চোখ দু’টোকে কোনভাবে আয়ত্তে রেখে ঈশানের শরীরটা টাওয়ালে ভিজিয়ে নিখুঁতভাবে মুছে দিল।তারপর অন্য একটা শার্ট পড়িয়ে দিয়ে ঈশানের গায়ে কম্বলটা টেনে দিয়ে উঠতেই রেহানা, রুমে প্রবেশ করলো হাতে এক পেয়ালা সুজির হালুয়া নিয়ে।
_একটু দেরি হয়ে গেল।
_সমস্যা নেই আন্টি।
_মা আর একটু উপকার করো।ওকে একটু কষ্ট করে খাইয়ে দাও।রান্নাটা প্রায় হয়ে এসেছে।আমি একটু গুছিয়ে আসছি।তারপর ওর শরীরটা মুছে দেব।
ঈশা মাথাটা নিচু করে আমতা আমতা করে বলল,
_আন্টি…মানে…আম…মি ওনার শরীরটা মুছে দিয়েছি।
রেহানা যেন কথাটা শুনে আকাশ সমান খুশি হল।মুখে হাসির ঝলক ফুটিয়ে বলল,
_বড় উপকার করলে আজ তুমি আমার।আজ এই অসময়ে তুমি না থাকলে একা একা কী যে করতাম!
_প্লিজ আন্টি এভাবে বলবেন না।মানুষের জন্যই তো মানুষ।একজনের বিপদে যদি পাশে না দাঁড়াতে পারি তাহলে আমরা কিসের মানুষ।আপনি যান আমি ওনাকে খাইয়ে দিচ্ছি।

এটা বলেই ঈশা রেহানার হাত থেকে সুজির হালুয়ার পেয়ালাটা নিয়ে ঈশানের পাশে বসলো।ঈশানকে একটু উচু করে বালিশের সাথে ঠেস দিয়ে বসালো।চোখ দু’টো এখনো গাঢ় রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে।এখনও ভিষণ উত্তাপ শীরর।ঈশানকে বসাতেই বারবার ঢুলে পরছে।ওই জন্য ঈশা ঈশানের মাথাটা নিজের কাঁধের ওপর রাখলো।চামচে তুলে একটু একটু করে হালুয়া তুলে দিচ্ছে ঈশানের মুখে।খাওয়ার মাঝখানেই রেহানা এসে একটা নাপা এক্সট্রা ঔষধ দিয়ে গেল।খাওয়া শেষ হতেই ঈশা ঔষধটা খাইয়ে দিয়ে নিজের কাজে যাওয়ার জন্য সামনে পা বাড়াতেই ঈশান ঈশার হাতটা টেনে ধরলো।চোখ বন্ধ অবস্থাতেই নিজের কাছে টেনে নিলো ঈশাকে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই আঁকড়ে ধরলো বুকের মাঝে।ঈশাও তব্দা খেয়ে গেল ঈশানের এমন ব্যবহারে।ঈশানকে যত ছাড়ার জন্য অনুরোধ করছে ততই ঈশান জ্বরের ঘোরে আঁকড়ে ধরছে ঈশাকে।হঠাৎই ঈশান তার জ্বরে আচ্ছন্ন উত্তপ্ত ঠোঁট জোড়া ঈশার ঠোঁটে মিলিয়ে দিল।ঈশা পুরো ভয়ে একটুখানি হয়ে আছে।কে কখন এসব দেখে ফেলে ভেবেই আত্মা কেঁপে উঠছে ঈশার।অথচ ঈশানের থেকে নিজেকে ছাড়াতেও পারছে না।এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে ছুটে আসারও সাধ্য নেই ঈশার।ক্ষণিক বাদেই ঈশান ঈশাকে ছেড়ে দিয়ে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পরলো।

চলবে,,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777