খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ৮


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

আজ প্রায় অনেকদিন পার হয়ে গেল অথচ ঈশা কলেজে আসছে না।ঈশান খুবই  ব্যকুল হয়ে আছে ঈশার মুখটা দেখার জন্য।খুব অস্বস্থি লাগছে একটুখানি কথা বলার জন্য।কেন যে ঈশা কলেজে আসছে না ভেবেই পাচ্ছে না ঈশান।সেদিন যে কলেজে এসেছিল।একসাথে চটপটি খেয়েছিল সেই যে গেল, আর আজ অব্দি কলেজে পা রাখেনি।প্রায় দশদিন হতে চলেছে।এর মধ্যে একদিনও ঈশান কলেজে আসা বাদ দেয়নি।শুধুমাত্র ঈশাকে দেখার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠেছে।নানারকম উদ্ভট চিন্তাভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ঈশা অসুস্থ নয় তো!নাকি ওর কাছে কলেজে আসার টাকা নাই,নাকি ও আবারও কাজে বিজি হয়ে পরেছে।এমন হাজারো চিন্তাভাবনা এসে মাথায় ভর করছে।কোনভাবেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না ঈশান।সারাক্ষণই ঘুরে ফিরে ঈশার ভাবনা এসে মাথার মধ্যের সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে যাচ্ছে।
_কিরে এমন মন মরা হয়ে বসে আছিস কেন?(রবি)
_ভাল লাগছেনা(ঈশান)
_ঈশা কলেজে আসছে না, তাই তুইও ভাল নেই।এম আই রাইট?
_আরেহ তেমন কিছু না।চল,আজ এক জায়গায় যাই।
_কোথায় যাবি?
_আরেহ আগে চল না।গেলেই দেখতে পাবি।

ঈশা পায়ের ব্যথায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে। তবুও সব কাজ ওকেই করতে হচ্ছে। সাহায্য করার মত কেউ নেই।রান্নাকরা, ঘরদোর ঝাড় দেওয়া,বাসন মাজা,সবার কাপড়চোপড় ধোয়া এই মচকে যাওয়া পা নিয়ে সামলাচ্ছে।এশা বা সালেহা কেউ একটুও সাহায্য করছে না ওকে।ঈশা রান্না করছিলো আর পায়ের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলো তখনই দরজায় কে যেন নক করলো।
_এশা,এই এশা।বোন আমার দেখতো কে এসেছে।আমি পা নিয়ে যেতে পারছি না।
_আমি এখন যেতে পারবো না।আমি উপন্যাস পড়তেছি।তুই গিয়ে দেখ।

ঈশার এই পা নিয়ে চলাফেরা করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। অগত্যা পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজার কাছে গেল।দরজা খুলে দিতেই ঈশার চোখ ছানাবড়া। তার সামনে সেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে।কলেজের প্রথম দিন যে ছেলেটার চোখে চোখ আটকে গিয়ে ছিলো  ঈশার!
_আপনারা!! কেমন আছেন?(ঈশা)
_আর কেমন থাকবো বল?তোমার জন্য একজনের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে।
রবি কথাটা বলেই ঈশানকে চোখ মারলো।ঈশান রবির মাথায় আস্তে করে একটা চাপড় মেরে হেসে ফেলল।
ঈশা সে কথার পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
_কেমন আছেন আপনারা?
_আমি ভাল আছি।একজন বোধহয় ভাল নেই(রবি)
_ভেতরে আসেন?(ঈশা
ওরা ভেতরে এসে খাটের ওপর বসতেই রবির ফোনে কল আসলো।রবি উঠে গিয়ে ফোন রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করলো।
_পায়ে চোট লাগলো কী করে?(ঈশান)
_আরেহ ও কিছু না।আন্টি,মিলি,ছোট আন্টি সবাই কেমন আছে?
_সবাই ভাল আছে।কিন্তু নিজের এ কী হাল করেছো!আর কীভাবে পায়ে এমন ব্যথা পেলে?
_আপনি তো জানেনই আমি কী কাজ করি।ওইদিন কলেজ থেকে আসার পরের দিনই আবার কাজে যাই।আর সেদিন টুলের ওপর থেকে পরে গিয়ে পা’টা একটু ছিলে যায়।আর সম্ভবত মচকে গেছে।
_মেডিসিন নাওনি?
_না…. মানে(ঈশান)
_তুমি কী পাগল হয়ে গেছ।এই পা নিয়ে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছো।
একটু আমার কাছে এসো।কথাটা বলতেই রবি ভেতরে আসলো।
_ঈশান আমাকে এখনি উঠতে হবে।(রবি)
_সে কী?এইতো আসলেন।আর এখনি চলে যাবেন(ঈশা)
_কেন যাবি এখন?(ঈশান)
_আপুর ডেলিভারি হবে আজ।হসপিটালে নিয়ে আসছে।মা ফোন করছে এইমাত্র ।আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে।
_আচ্ছা তাহলে যা।আমি একটু পরেই আসছি হসপিটালে(ঈশান)
_আচ্ছা তাহলে আয় তুই(রবি)
কথাটা বলেই রবি চলে গেল।
_একটু আমার কাছে আসো(ঈশান)
ঈশা একটু দূরত্বে চেয়ারে বসে ছিল।ঈশান বলতেই খাটের ওপর এসে বসলো।
_পা’টা উপরে তোল।
_কেন?(ঈশা)
_আরেহ তোলই না।
ঈশা পা উপরে তলতেই ঈশান ঈশার পা’টা ধরলো।
_আরেহ কী করছেন কী?পা ছাড়ুন।
_হুঁশ! চুপ করে থাকো লক্ষ্মী মেয়ের মত।পায়ের বারোটা বাজিয়ে কলেজ যাওয়া বন্ধ করে বাসায় বসে আছে।অথচ একজন যে তাকে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে আছে সে খবর নেই(বিড়বিড় করে বলল)
_কিছু বলছেন?
_ক….কই না তো!
_ওহ্।আমি তো ভাবলাম কিছু বলেছেন।
ঈশা কথা বলছে এর মধ্যেই ঈশান ঈশার পায়ে কিছু একটা করলো।ঈশা চিৎকার দিয়ে চোখমুখ খিঁচিয়ে ঈশানের হাতটা খামচে ধরে রেখেছে।
ঈশান তাকিয়ে দেখলো ঈশার পুরো মুখটা লাল হয়ে গেছে।
_স্যরি এভাবে ব্যথা দেওয়ার জন্য। এছাড়া আমার কিছুই করার ছিলো না।তাহলে এই ব্যথা নিয়েই থাকতে হতো(মনে মনে বলল)
ঈশা চোখ মেলে ঈশানের দিকে তাকালো।ঈশানও সেই থেকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে ঈশাকে।ঈশার খেয়াল পরলো এখনো ও ঈশানের হাতটা খামচে ধরে রেখেছে।তাড়াতাড়ি নিজের হাতটা সরিয়ে নিতেই দেখলো ঈশানের হাতে ঈশার পাঁচটা নখ পুরো বসে গিয়ে রক্ত জমাট বেধে গেছে।

_ইশ আপনার হাতের বারোটা বাজিয়ে দিলাম।(মন খারাপ করে বললো)
_উঁহু!বারোটা না,তেরটা বাজিয়ে ফেলেছো।
ঈশানের কথা শুনে ঈশা ফিক করে হেসে দিল।
তখনই সেখানে সালেহা আসলো।এসেই সরু চোখে তাকাল ওদের দু’জনের দিকে।ঈশা সালেহাকে দেখেই পা নামিয়ে বসলো।
_তা এখানে কী রাস লীলা হচ্ছে শুনি?(সালেহা)
ঈশা বসা থেকে উঠে  দাঁড়ালো।মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
_মা ও হচ্ছে ঈশান।আমরা একই কলেজে পড়ি।
_আসসালামু আলাইকুম।আন্টি কেমন আছেন?
সালেহা ঈশানের কথায় পাত্তা না দিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলো,
_তা একই ক্লাসে পড়োস নাকি অন্য কিছু?লাজ লজ্জার মাথা খাইছোস? এভাবে ঘষাঘষি কইরা বইসা আছোস পাশাপাশি। কেউ আইসা যদি তোগো এই রাসলীলী দেহে।তহন কী হইবো?
ঈশা সালেহার কথায় লজ্জায় ইচ্ছে করছে মাটিতে মিশে যেতে।অন্যদিকে ঈশানও লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে।
একজন মানুষ বাড়িতে আসলে তার সাথে কীভাবে বিহেভ করতে হয় সেটা যে সালেহার জানা নেই ভালই বুঝতে পারছে ঈশান।বুঝতে পারলো এখানে বসে থাকলে তার ঝাল পোহাতে হবে ঈশাকে, তাই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
_ঈশা আজ আসি?
ঈশার চোখে পানি টলটল করছে।তবুও ধরা ধরা গলায় বলল,
_প্লিজ যাবেন না।একটু দাঁড়ান।আমি আসছি।
ঈশান ঈশার পানি টলমল চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।আবারও আগের জায়গায় গিয়ে বসলো।সালেহা ঈশানের আবারও বসা দেখে মুখ ভেংচি কেটে সেখান থেকে চলে আসলো।ঈশা তাড়াতাড়ি করে এক গ্লাস ট্যাংক গুলে নিল।আর একটা ডিম পোজ করে ছোট্ট ট্রেতে করে রান্নাঘর থেকে আসতেই,সামনে এসে দাঁড়ালো সালেহা
_ডিম যে ধরছোস?আমারে জিগাইছোস?তুই কামাই কইরা ডিম আনছোস? যে, তোর নাগরেরে ডিম দিবি?
ঈশা প্রতিউত্তরে কিছু না বলে শুধু বলল,
_মা আমি একটু পরেই শাহেদ চাচার দোকান থেকে ডিম কিনে দিমু।এখন একটু থামো প্লিজ।
ঈশা কথাটা শেষ করতেই সালেহা ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল ঈশার গালে।থাপ্পড়ের কারণে গ্লাসের শরবতের কিছুখানি ঢুলে পরলো ট্রেতে।
_ইনরেজী ছাড়ে আমার লগে।বেশি শিইক্ষালাইছোস মনে হয়।কথায় কথায় পিলিজ!তোর সাহস হয় কী করে? আমার মুখের ওপর কথা বলার।
ঈশা আর টু’শব্দও করলো না।নিশ্চুপ চোখের পানি ঝরছে।ঈশান সবটাই শুনছে।খুব খারাপ লাগছে ঈশানের।
সালেহা তার বকবকানি শেষ করে এগুলো এশার রুমে। ঈশা ওড়নার আঁচলে মুখটা মুছেই দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সামনের বারান্দায়।
টি টেবিলটা এগিয়ে নিয়ে সেটাতে ট্রেটা রেখে পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসলো।
ঈশান ঈশার দিকে তাকিয়ে আছে।পুরো গালটা লাল হয়ে গেছে।ভেতরে যে কী হয়েছে সেটা সবই এখান থেকে টের পেয়েছে ঈশান।
ঈশানের এভাবে তাকানো দেখে ঈশা মাথা নিচু করে বসে রইলো।
_প্লিজ এইটুকুনি খেয়ে নিন।(ঈশা)
_আমি খাব না।কেন এসব করতে গেলে?
ঈশা মুখে কোনরকম হাসি ধরেই বলল,
_আরেহ কী এমন করলাম।তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।
ঈশান ঈশার তাড়া দেওয়ার কারণটা ঠিকই বুঝতে পারছে।ঈশা শরবতের গ্লাসটা ট্রে থেকে নিয়ে ঈশানের সামনে এগিয়ে ধরলো।তখনি এশা এসে ছো মেরে ঈশার হাত থেকে শরবতের গ্লাসটা নিয়ে পুরোটা খেয়ে নিল।
ঈশা আর ঈশান দু’জনে স্তব্ধ হয়ে আছে এশার এমন কান্ড দেখে।এশা খাওয়া শেষ হতেই বাজে একটা ঢেকুর তুলে বলল,
_কী বানিয়েছিস এটা!ছিঃ খেতে কী বিষাদ হয়েছে!এত মিষ্টি কেউ দেয় শরবতে?
ঈশার লজ্জায়,ঘৃণায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।তবুও দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে বসে আছে।এশা গিয়ে ঈশানের পাশে বসলো।চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে।ওড়নার তো হদিশই নেই।পারে না যেন ঈশানের গায়ের সাথে লেপ্টে বসে থাকে।এশা বসতেই ঈশান কিছুটা সরে বসলো।
এশা ঈশানের দিকে হাতটা এগিয়ে দিল হ্যান্ডস্যাক করার জন্য
_হাই।আই এম এশা!
ঈশান হাতটা গুটিয়ে নিয়ে একটু হেসে বলল,
_আমি ঈশান!
_আপনাদের বাসা কোথায়?
_এইতো মুসলিম পাড়াতে।
_ওহ্।বাড়ির নাম?
_এশা তুই এখান থেকে যা।উনি এখানে তোর কাছে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসেনি(ঈশা)
_এটা কে ইন্টারভিউ বলে না। পরিচিত হওয়া বলে।কথাটা বলতে বলতেই হাত বাড়ালো ট্রেতে রাখা ডিম পোজের পিরিচের দিকে।ঈশা খপ করে এশার হাতটা ধরে ফেলল।চোখ রাঙানী দিয়ে বলল,
_মা তোকে ডাকছে।এশা লজ্জা পেয়ে ঈশানের দিকে তাকিয়ে হেসে চলে গেল।তবে ঈশা ভাল করেই জানে এই কাজের জন্য তাকে কী সাফার করতে হবে।এশা চলে যেতেই ঈশা পিরিচটা এগিয়ে দিল ঈশানকে।
_প্লিজ ঈশা এসব বন্ধ করো।এখন বল পায়ের কী অবস্থা?
_যেই ডাক্তারি দেখিয়েছেন এরপরেও কী খারাপ থাকতে পারি!
ঈশান ঈশার কথায় হেসে ফেলল।ঈশাও ঈশানের সাথে হাসিতে যোগ দিল।
_প্লিজ একটুখানি খেয়ে নিন।
_এত কিছুর পরেও তুমি আমায় খেতে বলছো?
ঈশার চোখে পানি চলে আসলো।
_অন্তত আমার জন্য! (ঈশা)
ঈশান পিরিচটা নিয়ে চামচের আগায় করে একটুখানি ডিম কেটে নিয়ে মুখে দিল।ঈশা একগ্লাস পানি এগিয়ে দিতেই,পানিটুকু খেয়ে নিল।
_এখন উঠি।কাল যেন কলেজে দেখতে পাই তোমাকে।
_যদি না যাই?
_তবে জোর করে বেধে নিয়ে যাব।
_কিসের অধিকারে?
ঈশান স্তব্ধ হয়ে ঈশার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বলে উঠলো,
_বন্ধুত্বের অধিকারে।
ঈশা ঈশানের কথায় হেসে ফেলল।
_কাল অবশ্যই যাব।
ঈশার কথাটা শুনেই মনটা ভাল হয়ে গেল ঈশানের।

আমি সত্যিই অনেক বিজি আছি।তাই গল্পটা দিতে লেট হচ্ছে।আশা করি এটা নিয়ে কেউ কোন মন্তব্য করবেন না।ধন্যবাদ

চলবে,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777