খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ৯


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

ঈশান চলে যেতেই সালেহা এশে ঈশার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বকাঝকা করতে শুরু করলো।আর এশা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।ঈশা করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এশার হাসিভরা মুখটার দিকে।ব্যথায় যতটুকু না কষ্ট হচ্ছে তার থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে এদের ব্যবহারে।দিন দিনই সবকিছু সহ্যের বাহিরে চলে যাচ্ছে। তবুও মুখ বুজে গর্ধবের মত সবটা হজম করে যাচ্ছে। আজ ওমর থাকলে ঠিকই মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতো।নিজে এসে ঈশাকে মায়ের হিংস্র থাবা থেকে ছুটিয়ে নিত।কখনো আজ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন হাসতো না।চোখ দু’টো বুজে রইলো ঈশা।
_মা ছাড়ো ব্যথা পাচ্ছি (করুন স্বরে বলল)
সালেহা ধাক্কা মারতেই চেয়ার সাথে ধাক্কা লেগে ফ্লোরে পরে গেল।কাঠের চেয়ারের সাথে ধাক্কা লাগায় অনেকটা হাত ছিলে যায়।সেই হাত নিয়েই আবার রান্নাঘরে ছুটলো।কাঁদছে আর রান্না করে চলেছে।আর কোন টুশব্দটি করেনি মুখ দিয়ে।

বিকেলবেলা ঈশান হাঁটতে বের হল।তখনই নজর পরলো হাতে।যেখানে ঈশার নখের দাগ বসে কালসেটে বর্ণ ধারণ করে আছে।হাতটা উঁচু করে সেই জায়গায় আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো।চোখের সামনে ভাসতে লাগলো সকালের ঘটে যাওয়া সেই দৃশ্যটা।মন্ত্রমুগ্ধের মত চোখ বুঝে সকালের দৃশ্যটা চোখের সামনে স্মৃতিচারণ করে চলেছে ঈশান।হঠাৎ কারো ধাক্কা লাগতেই পরে যেতে গিয়ে টাল সামলালো কোনরকমে।শার্টটা একটু ফাঁকা করে বুকে থুতু দিল।ঈশানের এমন কাণ্ড দেখে রবি আর রোহান হাসতে হাসতে খোলা রাস্তায় বসে পরলো।বিকেল হয়ে যাওয়ায় গাড়ির চলাচল নেই বললেই চলে।
_এই তোদের সমস্যা কী? এভাবে পাগলের মত হাসছিস কেন?(ঈশান)
_পাগল আমরা হলাম আর কই!পাগল তো হয়ে গেছোস তুই।নিজের হাতে নিজে চুমু খাচ্ছিস আবার চোখ বন্ধ করে হাঁটছিস,এগুলো কারা করে বল?
ঈশান রবির কথা শুনে পুরো চুপসে গেল।শ্যাম বর্ণের মুখটা ক্ষণিকের মধ্যেই রক্তিম আভায় পরিনত হল।ঈশানের এমন লজ্জা পাওয়া দেখে রবি আর রোহান হাসতে হাসতে রাস্তায় গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম।
_উফ থামবি তোরা।এমন ছাগলের মত কী হাসতাছোস?
_ঈশান তোর এত লজ্জা হইলো কবে থেকে? জানা ছিল না তো?(রোহান)
_থামবি তোরা?নয়তো কিন্তু আমি উল্টো পথ ধরবো।
_রোহান এবার বেশি হইতাছে কিন্তু। থেমে যাহ্।নয়তো কিন্তু আমাদের নায়ক আবার রেগে যাবে।বলেই আবারও শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলো রবি।
ঈশান ওদেরকে থামাতে না পেরে দু’জনকে মারতে শুরু করলো।

পরদিন খুব সকালেই ঈশান সেজেগুজে তৈরী হচ্ছে কলেজে আসার জন্য।
_কিরে ভাইয়া আজ এত সাজগোজের কারণটা কী শুনি?তার উপর সবে ঘড়িতে পৌনে আটটা বাজে।(মিলি)
_আরেহ যেতে যেতে সময় লাগবে তো।তাই তাড়াতাড়ি রওনা দিচ্ছি।
মিলি এক চোখ ছোট করে তাকালো ঈশানের দিকে।তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
_কিন্তু ভাইয়া আমি কিন্তু রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।কথাটা বলেই নাক দিয়ে শুকতে শুরু করলো।
ঈশানের এক ধমকে চুপ হয়ে গেল মিলি।
_সবসময় বেশি পাকনামি করিস।তোকে কেউ রাখছে নাকি আমার পিছে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য?
_শোন মোটেই আমি গোয়েন্দাগিরি করছি না।চোরের মনে যেমন পুলিশ পুলিশ ভাব,তোরও ঠিক সেইরকম দশা।এখন চল বড় মা নাস্তা করতে ডাকছে।
_মাকে বলে দে আজ খাব না।বাহিরে নাস্তা করে নেব।
তখনই ঈশানের মা এসে কান টেনে ধরলো ঈশানের।
_উহ্ মা ছাড়ো।ব্যথা পাচ্ছি তো।
_আমিও ব্যথা পাই।যখন এই বুড়ো ছেলেটার জন্য কষ্ট করে রান্না করি আর তখন সে যদি না খেয়ে চলে যায় তখন আমারও খারাপ লাগে।
কথাগুলো বলতে বলতেই কান টেনে ধরে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসালো।আর মিলি হেসে কুটিকুটি হচ্ছে আর ঈশান চোখ রাঙানী দিয়ে বারবার মিলিকে ধমকাচ্ছে।অবশেষে মায়ের হাতে খেয়ে-দেয়ে কলেজের পথ ধরলো।ঈশাও সকালের রান্নাবান্না শেষ করে ঘর দোর গুছিয়ে কলেজের জন্য বেরিয়ে পরলো।

ঈশা বরাবরই অটোতে যাতায়াত করে।আজও অটোতে উঠে বসলো।ঈশানেরও আজ ইচ্ছে হল অটোতে উঠবে।তাই নিজেদের মেইন রাস্তা পার হয়ে এসে অটোর জন্য দাঁড়ালো।শেষমেশ একটা খালি অটো পেয়েও গেল।ভেতরে পা রাখতেই সেই চিরচেনা দু’টো চোখের সাথে ঈশানের চোখের মিলন ঘটলো।খুশিতে আত্মহারা হয়ে ঠোঁটের কোণে বিশাল এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
_কেমন আছো?(ঈশান)
_ভাল।আপনি?
_আলহামদুলিল্লাহ খুব খুব খুব ভাল আছি!
ঈশানের এভাবে চোখমুখে খুশির আভা আর বলার ভঙ্গি দেখে ঈশা ফিক করে হেসে দিল।ঈশানও খানিকটা লজ্জা পেয়ে ঈশার সাথে হাসিতে তাল মেলালো।
_বাসার সবাই কেমন আছে?
_আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভাল আছে।তোমাদের?
_আলহামদুলিল্লাহ।
_বই কিনছো?(ঈশান)
_না।এখনও কেনা হয়নি।আজ কিনবো।একটু বইগুলো কিনতে হেল্প করবেন?
_অবশ্যই। আমরা তো কয়েকজনে ভাবছি প্রাইভেট শুরু করবো সামনের মাসেই।তুমি কী পড়বে?
_আসলে….এখনও বলতে পারছি না।যদি পড়ি তাহলে জানাবো।
_ঈশা!
কারো মুখে ভালবাসায় পূর্নতা মেশানো ডাক শুনে কেমন যেন, মনের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগলো ঈশার।এই ডাকটা যেন কত অজানা কথার জানান দিচ্ছে ঈশাকে।যেন এই ডাকটা ঈশানের মনের গহীন কোণের হাজারো লুকনো কথার বহিঃপ্রকাশ! নিজেকে কোন রকম সামলে নিলো ঈশা।সব কিছুতে এত গলে যাওয়া ঠিক না।এই ডাকটার তো অন্য মানেও হতে পারে।এসব ভেবেই আস্তে করে ঈশানের ডাকের জবাব দিল,
_হু!
ঈশান তখনও ঈশার দিকে মুগ্ধ চাহনিতে  তাকিয়ে আছে। যে চাহনিতে নেই বিন্দুমাত্র লোভ-লালসা।নেই কোন বাজ্জে ঈঙ্গিত!যেই চাহনিতে রয়েছে কারো জন্য মনের গভীর স্থল থেকে অকৃত্রিম ভালবাসা।কিছু না বলা কথা, চোখের ভাষায় উগ্রে দেওয়া!নিজের মনের সকল কথা ব্যক্ত করার এক অন্যতম পন্থা!ঈশা এই চোখে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারলো না।তাহলে যে এই চোখের গভীর সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যাবে।যেখান থেকে ফিরে আসা কোনক্রমেই সম্ভবপর হবে না।হলেও সেটা হয়ে যাবে অনেক ত্যাগের ফল।আর সব ত্যাগের ফল যে মিষ্টি হয় না।তেতোও হয় বটে!
_আমরা কী বন্ধু হতে পারি না?
ঈশানের মুখের কথাটা শুনে বুকের মধ্যে মৃদুঝড় বইতে লাগলো ঈশার।মনে মনে কেন যেন খুব আশঙ্কা হচ্ছে এই বন্ধুত্ব যদি কখনো অন্য কিছুতে রুপ নেয় তবে নিজেকে কী করে সামলাবে সে!ঈশাকে কিছু একটা ভাবতে দেখে ঈশান আবারও বলে উঠলো,
_প্লিজ ঈশা!
ঈশানের কথা শুনেই হকচকিয়ে তাকালো ঈশানের দিকে।গলাটা কেমন যেন কাঁপছে।কিন্তু এই কাঁপুনি কেন হচ্ছে, খুব বেশিই অজানা ঈশার।হালকা কাশি দিয়ে বলল,
_আমি তো আপনাকে বলেছি আমার পক্ষে কারও সাথে বন্ধুত্ব করা সম্ভব না।তবুও….
ঈশাকে থামিয়ে দিল ঈশান।আবারও করুণ কণ্ঠে বলে উঠলো,
_প্লিজ ঈশু!
কথাটা শুনেই থমকে গেল ঈশা।মুহূর্তেই চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে উঠলো ঈশার।ছলছল চোখে তাকালো ঈশানের দিকে।আজ কতদিন পর এই ডাকটা শুনলো।ছোটবেলায় আদর করে ঈশার মা এই নামে ডাকতো ঈশাকে।কখনোই ঈশা বলে ডাকেনি।সবসময় মেয়েকে ঈশু বলেই ডাকতো।ক্ষণিকের মধ্যেই চোখদিয়ে জল গড়াতে শুরু করলো।চোখের পানিতে মুখের ওপর বাধা হিজাবটাও ভিজে যাচ্ছে। তাই মুখটা খুলে নিলো।ঈশানও কথাটা বলে পুরো বোকা বনে গেল।ঈশার কান্নার কারণটা কিছুতেই অবগত হল না ঈশানের।অসহায়ের মত বারবার ঈশাকে প্রশ্ন করে চলেছে
_কী হয়েছে?কাঁদছো কেন?
ঈশাও কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলো।কান্নার কারণে মুখচোখ লাল হয়ে উঠেছে।ঈশান পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে ঈশার দিকে এগিয়ে দিল।ঈশাও কিছু না বলে চোখমুখ মুছে ঈশানকে রুমালটা ফিরিয়ে দিল।অটো চলেছে গন্তব্যে। দু’জনেই চুপটি করে দু’পাশে বসে রইলো।একজন মায়ের শোকে কাতর!আর অন্যজন প্রিয়তমার চিন্তায় বিভোর!

চলবে,,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777