খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

ঘাসফুল-পর্বঃ১৮


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

সকালবেলা ঘুম ভেঙে দরজা খুলতেই সালেহার মেজাজ প্রচন্ড গরম হয়ে গেল।ঈশা দরজার কাছে শুয়ে আছে।গায়ে একটা কাঁথা জড়ানো।এই কাঁথা কোথা থেকে পেল বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না তাকে।দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে জোর গলায় ডাকতে লাগলেন ওমরকে,

–ওমর,এই ওমর।
সালেহার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল ওমরের।এই শীতে কাঁথার ভেতর থেকে উঠে আসতে মন টানছে না তার।ওদিকে সালেহার ডাকে মনে হয় বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।না উঠে এসেও উপায় নেই।এক নাগাড়ে ডেকেই যাচ্ছে।ওমর চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বিছানা ছেড়ে এগুলো সদর দরজার দিকে।ওমর চোখ ডলতে ডলতে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো।ওমরকে দেখেই চোখ-মুখ কুঁচকে সালেহা প্রশ্ন করে বসলো,
–ওরে কেথা (কাঁথা) দিছে কে?
ওমর ভয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।কথার পিঠে কথা না বাড়ানোই এখন মঙ্গল।কাল যেভাবে থাপ্পড় খেয়েছে ভেবেই নিজের অজান্তে গালে হাত চলে গেল ওমরের।
— কী রে?কথার উত্তর দেস না ক্যান?
ওমর সালেহার কড়া প্রশ্নে ঘাবড়ে গেল।আমতা আমতা করে হালকা গলায় বললো,
–আ…পুর শীত করছিলো তাই দিয়েছি।
সালেহার চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ঈশার।গা থেকে কাঁথা সরিয়ে শোয়া থেকে উঠে চুপচাপ বসে রইলো।
সালেহা ওমরকে ছেড়ে ঈশার দিকে কঠিন দৃষ্টি ছুড়ে বললো,
–তুই এহনও এয়ানে কী করোস?
–…..
–কথা কস না ক্যান?চুরি কইরাও তোর শান্তি হয় নাই।এহনও এয়ানে পইরা রইছোস।চোরের ঘরে চোর পদাই হইছোস।
এ পর্যায়ে আর চুপ থাকতে পারলো না ঈশা।একরকম অগ্নিদৃষ্টি ছুড়ে বললো,

–খবরদার আমার মা’কে নিয়ে একটা বাজে কথাও বলবেন না আপনি।
–বাজে কথা কিয়ের…হু?তোর মায় তো চোরই ছিলো।আবার বড় বড় কথা কইতে আইছোস?
–আপনাকে কে বললো?আমার মা চোর ছিলো।প্রমাণ দিতে পারবেন আপনি?যদি প্রমাণ দিতে পারেন তো বিশ্বাস করবো আমার মা চোর ছিলেন।
ঈশার কথার পিঠে কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে সালেহা।মুখ-চোখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।ঈশা বেশ কড়া কণ্ঠে বলতে লাগলো,

–অনেক হয়েছে আপনার কারসাজি দেখা।এসব বন্ধ করেন।কী পেয়েছেন আপনি? একজন মরা মানুষের নামে বাজে কথা রটাবেন?এত নিম্ন মনোবৃত্তির মানুষ কেন আপনি।যেই মানুষটা বেঁচে নেই তাকে নিয়ে এসব নিন্দে-মন্দ না করলেই কী হচ্ছে না আপনার?আর বুঝতাম মা চোর ছিলেন তাই আপনি এসব কথা বলছেন।আমার মা খাঁটি রত্ন ছিলেন।আর ভুলেও কখনও আমার মা’কে নিয়ে এসব অবান্তর কথা যেন না শুনি আমি।
–শুনলে কী করবি তুই?
–গ্রামে তো চেয়ারম্যান -মেম্বার বলেও ব্যক্তিরা আছেন।প্রয়োজনে তাদের কাছে যাব।গতকাল যে সারারাত বাড়ির বাহিরে রেখেছেন মিথ্যে অপবাদে সেটা বলতেও আমার দু’সেকেন্ড সময় লাগবে না।অনেক সহ্য করেছি আমি।কাজের মেয়ের মত এই বাড়িতে পরে আছি।অথচ আমার নামে লিখা এই বাড়ি।আর আমাকেই এ বাড়ি থেকে তাড়ানোর জন্য আপনারা দুই মা-মেয়ে উঠে পঠে লেগেছেন।এই সব কথা আমি সবাইকে জানাবো
কথাগুলো বলেই হনহনিয়ে চলে গেল নিজের রুমে।সালেহার থেকে উত্তরের আসায় দাঁড়িয়ে রইলো না।পুরো গা জ্বলে যাচ্ছে ঈশার।কী করে মৃত ব্যক্তির নামে এসব কুৎসা রটাচ্ছে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না।
ওদিকে সালেহা ক্রোধে জ্বলতে লাগলো।তার চালে তাকেই এই মেয়ে বাজিমাত দিয়ে দিলো।এ মেয়েকে নিয়ে তো আর কোন ভরসা করা যায় না।একবার যদি এসব কথা গ্রামের কারো কানে যায় তাহলে তো আর রক্ষে থাকবে না।গ্রামের সবাই মিলে নিন্দে-মন্দ করে কয়েক কথা শুনিয়ে দেবে।

ঈশা নিজের রুমে এসেই ফ্রেস হয়ে কলেজের জন্য তৈরী হয়ে নিলো।কালকে যে একটা বড় ভুল হয়ে গেছে।সেই ভুলটা আজ যে করেই হোক শুধরে নিতে হবে।যে মানুষটা এত সাহায্য করেছে,সব বিপদে-আপদে ছাঁয়ার মত পাশে দাঁড়িয়েছে তাকে কী করে এতটা জঘন্য অপবাদ দিলো, ভেবেই নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে। আজ যেভাবেই হোক সবটা মিটমাট করে নেবে। নিজে থেকেই স্যরি বলে নেবে।এর আগে যতবারই এমন হয়েছে ততবারই ঈশান আগ বাড়িয়ে স্যরি বলেছে।কী করে এত বড় কথাগুলো কাল বললো ভেবেই এখন খুব খারাপ লাগছে।কাল সারারাত চিন্তায় দু’চোখের পাতা এক করতে পারলো না।
দু’টো চিন্তা মাথার মধ্যে গেড়ে বসে ছিলো।
এক, কোথায় যাবে,কী করবে,কী খাবে?এসব কথাগুলো পুরো মাথাটাকে ধরিয়ে দিয়েছে।এসবের মাঝেও ঈশানকে করা অপমানগুলো বারবার তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তখন ঈশানের মুখটা দেখে কেন যেন বুকটার মধ্যে কেঁপে উঠেছিলো।কথাগুলো শোনার সাথে সাথে হাসি ভরা মুখটা মিলিয়ে গেল।সেখানে এসে একরাশ দুঃখ ভর করলো।যখন ঈশা শেষের কথাগুলো বলছিলো তখন স্পষ্ট ঈশানের চোখের কোণে জল টলমল করছিলো।তখন যেন ঈশানের থাপ্পড়ের চেয়েও ঈশানের চোখের পানিটুকু খুব বেশি কষ্ট দিচ্ছিলো তাকে।কী রকম রক্তিম আকাড় ধারাণ করেছিলো চোখ জোড়া।কিন্তু সেই চোখে কেন ঈশা একটুও তার প্রতি ঘৃণার চিহ্ন দেখলো না,ঘৃণাই তো করাই উচিত ঈশাকে।এত কিছুর পরেও সে কী করে এত বড় অপবাদ দিতে পারলো?সেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করা চোখের কোথাও যেন ঈশার জন্য একটুও ঘৃণা দেখলো না, না দেখলো বিন্দু পরিমাণ রাগ!কথাগুলো ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসছে।কোথাও যেন খুব বেশি জ্বালা করছে।তাড়াতাড়ি টেবিল থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক ঢোক পানি খেল।না…কোনভাবেই যেন জ্বালাটা কমছে না। বরং আরও যেন দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে।অজানা একটা কম্পন এসে পুরো শরীরটাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। কোনরকম তাড়াহুড়ো করে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল ঈশা।একটা অদ্ভুত শক্তি তাকে টানছে আজ।কোনভাবেই সেখানে না যাওয়া অব্দি মনে শান্তি পাচ্ছে না।ঈশাকে হনহনিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে সালেহা পিছু ডাকলো,

–ঈশা,এই ঈশা?তুই কই যাস?
থমকে দাঁড়ালো ঈশা।এখন যে একদফা কৈফিয়ত দিতে হবে সেটা বুঝতে খুব একটা সময় লাগলো না।হালকা গলায় জবাব দিলো,
–কলেজে যাচ্ছি।
–তুই যে কলেজে যাইতেছোস রান্না-বান্না করবো কেডা?
–কেন? একদিন তোমরা করতে পারবে না?
–তোর তো বেশ ভালই সাহস হইছে দেখতাছি।
মোহে কথার খই ফুঠছে।কথা তো একখানও দেহি মাটিত পরে না।
সালেহার এসব নিতান্ত সাধারণ কথা শোনার খুব প্রয়োজন মনে হলো না ঈশার।এমনিতেই অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করছে তার ভেতরে।এই সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথার উত্তর দিয়ে সময় নষ্ট করাটা কোন যৌক্তিক বলে মনে হলো না।কথার পিঠে কোন কথা না বলেই এগুলো সামনের দিকে।

সালেহা পেছন থেকে তার মতো বকাঝাকা করতেই লাগলো।সেগুলো ঈশা যেন কানেই শুনতে পেল না।কলেজে এসেই মেইন গেট থেকে চোখদু’টো হন্যে হয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু যেদিকেই তাকাচ্ছে সেদিক থেকেই মর্মাহত হয়ে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে ঈশা।তাড়াতাড়ি ক্লসের দিকে রওনা হলো।সবশেষে এই একটাই ভরসা।মনে একটা ভয় এসে ভর করলো।যদি ক্লাসেও ঈশান না থাকে তবে কী হবে?না কোন ভাবেই মনটাকে বুঝ দিতে পারছে না।ক্রমেই হাঁটার গতি স্লো হয়ে আসছে।পাগুলো যেন সামনে এগুতেই চাচ্ছে না।যত সামনের দিকে যাচ্ছে ততই যেন ভয়টা গেড়ে বসছে ভেতরটায়।যদি সত্যি সত্যিই ঈশান না আসে তাহলে তো এই মনের অস্থিরতাটা কিছুতেই কমবে না।আরও কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যাবে।কালকের সেই ঘটনার পর থেকেই অস্থিরতায় আছে।এখন যদি ঈশানকে না দেখে,তার সাথে কথা না বলতে পারে তবে যেন আজ সে মরেই যাবে।কিন্তু কেন এমন অনুভূতি  হচ্ছে তার, সেটাই মাথায় আসছে না।মাথার স্ক্রুগুলো যেন সব ঢিলে হয়ে গেছে।কাজ কারার ক্ষমতাটুকুও যেন লোপ পেয়েছে।ধীর পায়ে পা ফেলে এগিয়ে চললো ক্লাসের দিকে।ক্লাসে ঢোকার আগে যতটুকু এক্সাইটেড ছিলো ক্লাসে পা রাখতেই তার থেকে দ্বিগুন আশাহত হলো ঈশা।না…ক্লাসের কোথায় ঈশান নেই।চোখ জোড়া ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খোঁজার পরে কোথাও ঈশানের দেখা মিললো না।মনের ভেতরের একটুখানি আশার প্রদীপ মুহূর্তেই ধপ করে নিভে গেল।সেখানে এসে ভর করলো অনেকটা সংশয়।কেনো ঈশান আজ আসলো না?কাউকে জিজ্ঞেস করবে ভেবেও করতে মন চাইছে না।তখনই ক্লাসে আগমন ঘটলো রবি আর রোহানের।
–হাই ঈশা!কেমন আছো?(রোহান)
–ভাল।
রোহানকে খুব একটা সুবিধার মনে হয় না ঈশার।সবসময় রোহানই আগ বাড়িয়ে এটা- সেটা জিজ্ঞেস করে। ঈশা শুধু টুকটাক দু’একটা কথা বলেই পাশ কেটে চলে যায়।
–রবি একটু কথা ছিলো(ঈশা)
রবি নিজের সিটে বসেই বললো,
–হ্যাঁ… বল?
ঈশা এভাবে দূরুত্বে দাঁড়িয়ে কীভাবে কথা বলবে ভেবে পাচ্ছে না।অগত্যা নিজের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।নিজের ভেতর কেমন একটা জড়তা কাজ করছে।রবিকে কী ঈশানের কথা জিজ্ঞেস করবে?নাকি করবে না।জিজ্ঞেস করাটা কী উচিত!নাকি উচিত না।কিছুতেই কিছু মাথায় ঢুকছে না।অথচ কলেজে আসার উদ্দেশ্য ঈশানের সাথে কথা বলা আর এখন এত সংশয়! নিজেকেই আজকাল বড্ড অপরিচিত লাগে নিজের কাছে।ভাবতে ভাবতেই রবির পাশে বসলো।রবিও যেন কেমন পাল্টে গেছে।ভাবমূর্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ঈশা সামনের ব্যাঞ্চে বসে আছে তবুও রবি আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে না, কেন ডাকছিলে।সে নিজ মনে বইর পাতায় মুখ গুজে বসে আছে।
ঈশাই মুখ খুললো,
–রবি!
রবি বইর পাতায় মুখ গুজেই জবার দিলো,
–হ্যাঁ… কিছু বললে বল?
–ঈ…ঈ…ঈশান কোথায়?
–বাসায়।কোন জড়তা নেই রবির কণ্ঠে।স্পষ্ট স্বরে বলে দিলো।
–আসেনি কেন আজ?
–ও অসুস্থ!
কথাটা শুনেই একটা ভারী ধাক্কা লাগলো।
আর যেন কোন কথা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না।তবুও জিজ্ঞেস করলো ঈশা।কিন্তু কেন জিজ্ঞেস করলো নিজেও জানে না।হয়তো জিজ্ঞেস করাটা উচিত মনে হলো!
–কী হয়েছে ওর?
–জ্বর,সর্দি,কাশি!
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও,সেদিকেমপাত্তা না দিয়ে কোনমতে নিজেকে সামলে নিলো ঈশা।না মনটা আর সায় দিচ্ছে না এখানে বসে থাকার।একটিবার চোখের দেখা না দেখলে ছন্নছাড়া মন আজ পাগল করে দেবে তাজে।ইদানিং মনটা যেন তার আয়ত্তে থাকতে চায় না।একদিকে ঘুরাতে চাইলে মন চলে আর একদিকে।কোনভাবেই মনটাকে নিজের দখলে আনতে পারছে না সে।তবে কী মনটা চুরি হয়ে গেল!কেউ কী নিয়ে নিলো এই মনের ভাগটুকু!সোজা ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসলো ঈশা।

আবারও পরে গেল দ্বন্দ্বে!কীভাবে দেখবে ঈশানকে!দেখতে হলে তো ওদের বাসায় যেতে হবে।আর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তখন কী জবার দিবে!এসব সাত-পাঁচ ভেবে মনকে শান্ত করলো কিছু একটা বলে বুঝ দিয়ে দেবে।মেইন গেট ছেড়েই সোজা অটোতে উঠলো।উদ্দেশ্য ঈশানদের বাড়ি!

–মিলি, এই মিলি দেখতো কে এসেছে(রাবেয়া)
–আচ্ছা মা দেখছি আমি।
মিলি ওড়নাটা নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে এগুলো সদর দরজার দিকে।দরজা খুলতেই খুশিতে আত্মহারা মিলি।কোন কিছু না বলেই ঈশাকে জড়িয়ে ধরলো।
–আন্টিরা কোথায়?(ঈশা)
–মা,বড় মা দু’জনেই রান্নাঘরে।
–কেমন আছে ওনারা?
–ভাল।
মিলি বেশ বুঝতে পারছে ঈশার মনে কিছু একটা চলছে।ঈশার চোখ-মুখ দেখেই একটা খটকা লাগলো মিলির।চোখ-মুখ কেমন ফুলে গেছে।চিখের নীচটায় হালকা কালির রেখা পরেছে।দীর্ঘ সময় কান্না করলে যা হয় আরকি।প্রশ্নগুলো করলেও তার চোখ কিছু একটা খুঁজে চলেছে।
–আচ্ছা ভেতরে এসো।সবার সাথে কথা বলে জেনে নেবে কে কেমন আছে।
–নাহ্!
মিলি নাহ্ শুনেই কিছুটা অবাক হয়ে তাকালো ঈশার দিকে।ঈশাও অস্থিরতায় হুট করেই না বলে ফেলেছে।
–না মানে বেশি সময় নেই।ঈশানের থেকে একটা নোটস নেওয়ার দরকার ছিলো তাই এসেছি।ও তো আজ কলেজে যায় নি তাই।সামনেই তো পরীক্ষা ওই জন্য।
মিলি ঈশার এমন উত্তরে অনেকটা আাশাহত হয়েছে।বেশ বুঝতে পারছে ঈশা কিছু একটা লুকাচ্ছে।
–ঈশান কোথায়?
–ভাইয়া ওর রুমে শুয়ে আছে।ভীষণ জ্বর গায়ে।
ঈশা সেদিকে খেয়াল না করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ঈশানের রুমের দিকে।রুমের কাছে আসতেই ধুকপুকানিটা বেড়ে গেল।হাঁটার গতি ধীর হয়ে আসলো।আস্তে আস্তে পা ফেলে ঈশানের মাথার কাছে গিয়ে বসলো।খানিকটা সময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো ঈশানের মলিন মুখটার দিকে।এই মানুষটাকে কী করে এতটা আঘাত করেছিলো সে বুঝে আসছে না।হাতটা আলতো করে ঈশানের কপালে রাখলো।কারো ঠাণ্ডা হাতের কোমল স্পর্শ পেতেই আস্তে করে চোখ মেললো ঈশান।গায়ে খুব জ্বর।চোখগুলো কেমন গাড় লাল বর্ণের আকাড় ধারণ করেছে। চোখের কোণ বেয়ে মৃদুভাবে জল গড়াচ্ছে। চোখের পানি দেখতেই বুকটা ধক করে কেঁপে উঠলো ঈশার।ভেতর থেকে কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।ঈশান শীতল চোখে তাকিয়ে আছে ঈশার মুখের দিকে।
–কেমন আছো?(ঈশা)
ঈশান কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
–ভাল।তুমি?
ঈশা ঈশানের কণ্ঠ শুনেই যেন আবেগী হয়ে পরলো।খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে ঈশানকে জড়িয়ে ধরে।কথা বলার বাক শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
–কী হলো এখনও আমার ওপর রাগ করে আছো?কথা বলবে না?
ঈশানের এমন ধরা গলায় কথাগুলো শুনে ঈশা কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বললো,
–আমি রাগ করে নেই ঈশান।প্লিজ আমায় ক্ষমা করো।
ঈশান বালিসে হেলান দিয়ে উঠে বসলো।
–ঈশা বিশ্বাস করো আমি তোমাকে কখনো ওসব ভেবে হেল্প করিনি।আমি কখনোই ওই চিন্তাভাবনাকে মনের আশেপাশে কোথাও জায়গা দেইনি।(ঈশান)
–আমি জানি তুমি কখনোই এমন না।(ঈশা)
–তুমি আমাকে ক্ষমা করেছো তো?কথাটা বলেই ঈশার গালে হাত রাখলো।যেই গালে ঈশাকে থাপ্পড় মেরে ছিলো।
–খুব লেগেছে তাই না?সত্যিই আমি না এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।খুব কষ্ট লাগছিলো কালকে।
ঈশার একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না ঈশানের হাতটা নিজের গাল থেকে সরিয়ে নিতে।কেমন যেন এক অজানা প্রশান্তি লাগছে ভেতরটায়।ঈশা শীতল চাহনিতে তাকিয়ে আছে ঈশানের জলে টলমল করা চোখজোড়ার দিকে।কী মায়া এই চোখ জোড়াতে!এই স্নিগ্ধ চাহনি যেন মনের ভেতরের মৃদু ঝড়টাকে ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে।
–জানো তোমাকে থাপ্পড় মারার পর কলেজ থেকে এসেই ট্যাংকির ঠাণ্ডা পানিতে অনেক্ষণ ভিজেছি।তবুও জানো নিজেকে শান্ত করতে পারছিলাম না।খুব অসহ্য যন্ত্রণা লাগছে।
ঈশা এবার চুপ থাকতে পারলো না।অস্বাভাবিক কোমল স্বরে বললো,
–তুমি এমনটা না করলেও পারতে!এখন দেখলে কী হাল হয়েছে তোমার?(ঈশা)
তখনই মিলি একটা ট্রেতে করে নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে এসে ঢুকলো ঈশানের রুমে। ঈশান ঈশার গাল থেকে হাতটা নামিয়ে নিলো।
–আপু আগে নাস্তা করে নাও।পারলে তোমার এই বন্ধুটাকেও একটু কিছু খাইয়ে দাও।সকালে বড় মা কোনরকম একটু খাইয়ে দিয়ে ছিলো তারপর সব বমি করে ফেলে দিছে।তুমি পারলে একটু কিছু খাওয়াও।
–মিলি, তুমি কোথায় যাচ্ছো?আসো একসাথে খাই।(ঈশা)
–না গো আপু আমার এখন এক্সাম চলতেছে তাই একটু পড়তেছি।আর এমনিতেও এখন ক্ষুধা নাই।
ঈশা শুধু একটু ম্লান হাসলো।যেটা না হাসলেই নয়।
–কিছু খাও।না খেয়ে থেকো না।ঔষধ খেয়েছো?
–হুম।তবে এখন খেতে পারবো না।বমি আসে
–দেখ একদম বাচ্চাদের মত করবা না।চুপচাপ লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়ে নিবা।
ঈশা ঈশানের দিকে সেমাইর বাটি এগিয়ে দিলো।ঈশা দেখলো ঈানের হাত কাঁপছে খুব।
–আমাকে দাও।কথাটা বলেই ঈশানের থেকে বাটিটা নিয়ে নিলো।
–হা করো(ঈশা)
ঈশান হা করছে আর ঈশা খাইয়ে দিচ্ছে।

–কিরে মিলি…ঈশা কোথায়?(রেহানা)
–ঈশান ভাইয়ার রুমে,পরীক্ষার পড়া দাগাচ্ছে।
–ওহ্।ওকে যেতে দিস না আজ।একেবারে খেয়ে যেতে বলিস।
–আচ্ছা।

–ঈশান এইবার উঠি অনেকটা সময় তো থাকলাম।ঈশানের কেন যেন মন টানছে না ঈশাকে ছাড়তে।তবুও তো না ছেড়ে উপায় নেই।ঈশান শুধু মাথা নাড়ালো।ঈশা দরজার কাছে আসতেই একটা মৃদু কণ্ঠ কানে ভেসে আসলো।
–ভালবাসি তোমায়… ঈশা!
থমকে দাঁড়ালো ঈশা!এই ভয়টাই এতদিন পাচ্ছিলো। পেছনে তাকনোটা কী ঠিক হবে?।যদি সত্যিইটা বুঝতে পারে ঈশান!তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! কখনোই যে ঈশানকে সত্যিটা বলা যাবে না।চাঁদ আকাশেই সুন্দর। তাকে যে চাইলেও ছোঁয়া যায় না।ঈশানও ঠিক আকাশের সেই দূর্লব বস্তুর মতো।যাকে চাইলেই নিজের করে পাওয়া যায় না।চাইলেই একটু ছুঁয়ে দেওয়া যায় না।যার সৌন্দর্য্য দূর শুরু থেকেই উপভোগ করা যায়।তাকে ছোঁয়ার অনর্থক চেষ্টা না করাই বোধহয় ভাল।অযথা ছুঁতে গেলে হয়তো জীবনটাই বৃথা হবে।তার থেকে এসব চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দেওয়াই মঙ্গল।না…কিছুতেই ঈশা পেছনে ফিরবে না।কোন মায়ায় জড়াবে না নিজেকে!জড়াবে না কোন বন্ধনে।দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল ঈশা।পেছন থেকে এক জোড়া অশ্রুসিক্ত চোখ তাকিয়ে রইলো কারো চলে যাওয়ার পানে……

চলবে,,,,,,

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777