খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

চাকচিক্য


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

মুখে একগাদা মেকআপ করে নীলা এসে আবিরের সামনে দাঁড়ালো। ঠোঁটের কোণে প্রসস্থ হাসির রেখা টেনে বললো,
_দেখো তো,কেমন লাগছে আমাকে?”
_বরাবর যেমন পেত্নীর মত লাগে এবারও তেমনই লাগছে।”
নীলা ঠোঁট উল্টিয়ে বললো,
_তুমি এভাবে বলতে পারলা?”
_না পাড়ার কী আছে? এটা তো আমার নতুন বলা কথা নয়! তুমি যতবারই তোমার পেত্নী মার্কা সাজ নিয়ে এসেছো আমার সামনে, ততবারই আমি এমন কথাই বলেছি।”

নীলা আর এক মুহূর্তও আবিরের সামনে দাঁড়ালো না। হনহন করে ওয়াশরুমে চলে গেল। আর আবির মিটিমিটি হাসছে ।বরাবরই নীলা আবিরের সাথে কোনো বিয়ে বাড়ীর ফাংশন বা পার্টি যেটাতেই হোক না কেন যাওয়ার আগে এমন সাজবে। আর আবিরকে জিজ্ঞেস করবে কেমন লাগছে? আর আবিরও কম যায় না! বরাবরই একই উত্তর দিবে। আর নীলা গাল ফুলিয়ে সব মেকআপ ঘষে-ঘষে তুলে ফেলবে। আজও তার ব্যতিক্রম কিছো হলো না।

নীলা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে বসলো।এতক্ষণ যে সাজে ছিলো সব তুলে ফেলেছে।আবির বললো,
_এই তো এখন খুব সুন্দর লাগছে। একেবারে ন্যাচারাল লুক। মেয়েদর এই ন্যাচারাল লুকেই বেশ মানায়।”
আবিরের কথা শুনে ভেংচি কাটলো নীলা।তারপর ড্রেসিংটেবিলের ওপর রাখা গোল্ড প্লেটের গয়নাগুলো একে একে পড়তে লাগলো। গয়নাগুলো পড়া শেষে চোখের নিচে হালকা করে কাজলের রেখা টেনে দিলো। ঠোঁটে গাঢ় করে লাল ম্যাট লিপস্টিক দিলো।আয়নার দিকে তাকিয়েই বললো,
_দেখো তো এখন কেমন লাগছে? “
আবির একটু ঝুকে কাঁধ জড়িয়ে ধরলো নীলার।
_এখন খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু কোথাও যেন কী একটা কমতি আছে!”
_কী?”
_উমম দাঁড়াও।”
বলেই ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে টিপের পাতাটা নিয়ে একটা কালো টিপ পড়িয়ে দিলো নীলাকে।
_এবার সম্পূর্ণ লাগছে। কিন্তু মুখটা এমন প্যাঁচার মতো করে রেখেছো কেন?”
_তো কী করবো? পার্টিতে সবাই কত গর্জিয়াস ড্রেস,ব্রাইডাল মেকআপ করে আসবে আর আমিই যাব ফকিন্নির মতো। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দামের একটা শাড়ী আর গোল্ড প্লেটের গয়না। আমার ব্যক্তিত্বটা কোথায় থাকবে একবার বলতে পারো?”
_তোমাকে কে বললো যে, ড্রেসআপ-জুয়েলারি দেখে কেউ কারো ব্যক্তিত্ব পরিমাপ করে?”
_কেউ বলা লাগে না।আমি নিজেই জানি। আজ নির্ঘাত তোমার স্যারের বউ বিশ-ত্রিশ হাজার টাকার শাড়ী পড়বে। কত দামী দামী গয়না পড়বে আর সেখানে আমি এই সস্তা শাড়ী-গয়না পড়ে পার্টিতে যাব। নির্ঘাত সবাই আমাকে চিপ মাইন্ডের মনে করবে।”
আবির একটু বেখেয়ালিভাবে হাসলো। তারপর   মসৃণ গলায় বললো,
_জানো নীলা?”
_কী?”
নীলার কণ্ঠে প্রগাঢ় তেজ। যেটা বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না আবিরকে। আবির সেদিকে মন না দিয়ে নিজের মতো বলতে লাগলো,
_তুমি কী শেখ সাদীর গল্পটা পড়েছিলে?”
নীলা, আবিরের কথা অগ্রাহ্য করে শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে বললো,
_মনে নাই এখন।”
_তাহলে একটু গল্পটা শোন।”
নীলা বিরক্তিকর কণ্ঠে বললো
_এখন গল্প শোনার সময় না।”
_প্লিজ শোনই না। ছোট্ট একটা গল্প। বেশি টাইম লাগবে না।”
অগত্যা বাধ্য হয়ে শুনতে হচ্ছে আবিরের সেই গল্প!
_একবার শেখ সাদী কাজের সুত্রে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের যায়গায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। কিন্তু থাকার মতো কোন জায়গা ছিলো না। তাই তিনি এক আমীরের বাড়ীতে রাতটুকু থাকার জন্য আশ্রয় নেন। উনি সেদিন খুব সাধারণ পোশাক পরেছিলেন। তো ওই বাড়ীর লোকজন শেখ সাদীকে খুব সাধারণ মানেরই খাবার খেতে দিয়েছিলেন। পরের দিন শেখ সাদী তার কাজে রওয়ানা হন। কাজ শেষ করে আসার পথে আবারও তিনি ওই আমীরের বাসায় আশ্রয় নেন রাতটুকু থাকার জন্য। এবার তিনি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ড্রেস পরেছিলেন। এবার ওই আমীর, শেখ সাদীকে বেশ ভালমন্দ রান্না করে খেতে দিলেন ।আর শেখ সাদী সেই খাবারগুলো না খেয়ে পকেটে ভরতে লাগলো।এটা দেখে ওই আমীর কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস  করলো, “আপনি খাবারগুলো পকেটে ঢুকাচ্ছেন কেনো?”
তখন শেখ সাদী উত্তর দিলো,এগুলো আমার পকেট খাবার যোগ্য!আমি না। আমীর শেখ সাদীর কথা শুনে খুব লজ্জা পেলো। নিজের ভুলও বুঝতে পারলো। তাহলে এবার তুমিই বলো? ড্রেসাআপ কী করে কারো ব্যক্তিত্ব হতে পারে? মানুষটা ব্যক্তিত্ববান কিনা সেটা সম্পূর্ণ  নির্ভর করে মানুষটার আচরণে,তার চাল-চলন,কথা বলার বচনভঙ্গীর দ্বারা, তার বেশভূষা দ্বারা নয়। এরপরেও যদি তুমি স্যারের বউর কথা বল, সেক্ষেত্রে একবার ভাবো তো, কোথায় স্যার আর কোথায় আমি! স্যার কোটি কোটি টাকার মালিক আর আমি সেখানে স্যারের একজন ভেতনভুক্ত কর্মচারী। কিসের সাথে কী তুলনা দিচ্ছো তুমি?

_তোমার তো এই এক অভ্যাস? খালি কথায় কথায় উদাহারণ টানো।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বলেছেন,কাজী নজরুল ইসলাম কী বলছেন,বিখ্যাত মনিষীরা কী বলেছেন এসব নিয়েই তো থাকো তুমি।”
_আরেহ রাগ করো কেন? এই বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষগুলো তো ঠিকই বলেছেন। তাঁদের কোন কথাটা আজ অব্দি ভুল প্রমাণিত হয়েছে? যদি এমন একটাও দেখাতে পারো তাহলে সত্যিই বিশ্বাস করবো তাঁরা সবাই ভুল ছিলেন।”
_হুঁ। হইছে হইছে অহন চলো। তোমার উদাহরণ শুনে আর কোনো কাজ নাই।”

পুরো পার্টিতে সবাই খুব ইনজয় করলো। কিন্তু যখন আবির আর নীলা বাড়ীর পথে রওয়ানা দিলো তখন থেকেই নীলা মুখটা গোমড়া করে রেখেছে। ওই তো, বড়া পিঠা মুখের মধ্যে দিলে যেই রকম হয় ঠিক সেই রকম করে রেখেছে মুখটা ।আবির বেশ ভালই বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে নীলার। তবুও পথে কিছু জিজ্ঞেস করলো না আবির। বাড়ীতে এসে আয়নার সামনে বসে গয়নাগুলো খুলছে নীলা।কিন্তু মুখটা সেই আগের মতোই করে রেখেছে।আবির ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নীলাকে আগের মতো মুখভার করে রাখতে দেখে বললো,
_কী হয়েছে আমার নীলুর?”
_নিশ্চুপ
_কী হলো কিছু বলছো না কেন?”
_কী বলবো? হ্যাঁ, তুমি আমাকে একটুও ভালবাসো না!
আবির পেছন থেকেই দু’কাধ জড়িয়ে ধরলো নীলার!
_কে বললো? আমি আমার নীলুকে ভালবাসি না!”
_কে আবার বলবে? আমি নিজেই জানি!তুমি দেখেছো তোমার স্যার ওনার বউকে কত ভালবাসে! ওনাদের এনিভার্সেরি উপলক্ষে কত্ত দামী একটা কার গিফট করেছে ওনার বউকে!আর তুমি কী করো? আমাদের এনিভার্সেরিতে হয় আমাকে একটা শাড়ী দাও নয়তো একটা থ্রি-পিছ। এসব দিয়েই উদ্ধার করে ফেলো আমাকে। জীবনেও তোমার হাত দিয়ে দামী ড্রেস কিনে দাও না আমাকে।”
কথাগুলো শুনেই আবির টেনে তুললো নীলাকে। নিজের দিকে ঘুরিয়ে নীলার পরনের শাড়ীটা দেখিয়ে বললো,
_এটা কী খুব সস্তার শাড়ী?”
_তা নয়তো কী?”
_আচ্ছা একবার ভাবো তো তোমার থেকেও যারা কম দামী শাড়ী পড়ে তাদের কথা! এই যে,তোমাকে পাঁচ হাজার টাকার শাড়ীটা কিনে দিলাম,একবারও কী ভেবেছো যারা রিক্সা চালায়, দিন মজুরের কাজ করে তাদের বউদের কথা। এই পাঁচ হাজর টাকা তাদের এক মাসের সংসার চালানোর খরচ। তাদের বউরা হয়তো বড়জোর চার-পাঁচশো টাকা দামের শাড়িই পড়ে। তুমি কী তাদের থেকেও ভালো নেই? সবসময় নিজের থেকে যারা নিচু পর্যায়ে আছে তাদের দিকে তাকাবে। তাদের পরিস্থিতিটা দেখার চেষ্টা করবে। দেখবে তাদের থেকে তুমি হাজারগুণ ভালো আছো। ভুলেও কখনো নিজের থেকে উপরের কারো দিকে তাকাবেনা। তাহলেই অন্তরদ্বন্ধে ভূগবে। বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্মাবে। নানাবিধ চিন্তাভাবনা মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাবে।এতে করে তুমি তোমার চাহিদা পূরন না করতে পারলে মর্মাহত হবে। কী দরকার এত উচ্চবিলাসীতা করার? এমনিতেই  তো আমরা দিব্যি ভাল আছি তাই না?”
_নিশ্চুপ
_এরপরেও যদি তুমি স্যারের সাথে তুলনা করো সেক্ষেত্রে তোমাকে বলি, তুমি কী এমন জীবন চাও? যে জীবনে কারো প্রতি ভালবাসা নেই, নেই কোন কেয়ার,নেই কোন দায়িত্ববোধ।এমন জীবন কি তুমি চাও?”
_এখানে এসব বলার মানেটা কী?”
_মানেটা খুব সোজা। এই যে তুমি ভালবাসা বলতে দামী দামী গিফটকে বুঝিয়েছো।একবারো কী খেয়াল করে দেখেছো ?সত্যিই কী স্যার আর মেডামের মধ্যে ভালবাসা আছে?জাঁকজমকপূর্ণভাবে পার্টি থ্রো করে দামী দামী সারপ্রাইজিং গিফট দিলেই ভালবাসা হয়ে যায় না নীলু! এই যে পার্টিতে স্যার দিব্যি অন্য একটা মেয়ের সাথে ডান্স করেছে আর মেম অন্য ছেলেদের সাথে। একবার ভাবো তো তুমি বা আমি কেউই কী এটা মানতে পারতাম?স্যারের ছেলে কখন ঘরে ফিরলো,মেয়ে কখন ঘর থেকে বের হলো,কে খেলো কে না খেলো সেদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু দিন শেষে সবাই একা। কেউ কাউকে বোঝে না। কেউ কাউকে ভালবাসে না,কেয়ার করে না। মায়ের কাছে নেই মেয়ের খেয়াল,বাবার কাছে নেই ছেলের খেয়াল। স্বামীর চিন্তা নেই বউ কোথায় গেল,বউর চিন্তা নেই স্বামী কোথায় গেল। সবাই নিজেকে ফূর্তিতে মজিয়ে রেখেছে। স্যার প্রায়ই বিভিন্ন নাইট ক্লাবে যায়। মেমও হয়তো এমনটাই করে। কারণএসব তাদের কাছে ফ্যাশন। আর স্যারের ছেলে-মেয়ে দু’টোরও সেম অবস্থা। আজ দেখেছো মেয়েটা কী বাজে ড্রেস পরেছে? এসব কে ব্যক্তিত্ব বলে না নীলু।এসবকে বলে ঊশৃঙ্খলতা।দেহের আশিভাগ অন্যকে দেখানোকে কখনোই ব্যক্তিত্ব বলে না।তোমার কাছে পৃথিবীটা খুব বেশিই রঙিন মনে হতে পারে। বাহিরের এসব চাকচিক্য দেখে খুব সহজেই তুমি মুগ্ধ হতে পারো! বাট আম সিউর তুমি দুইদিনও এই লাইফ লিড করতে পারবে না। অস্থির হয়ে যাবে এ জীবন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। মরিচিকার মতো ভালবাসার পেছনে ছুটবে। কারণ ভালবাসা ছাড়া যে,জীবন চলে না। ভালবাসা ছাড়া জীবন, অচল সিকিতে পরিণত হয়!”

নীলা আবিরের বলা প্রতিটা কথা মনযোগ সহকারে শুনলো। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো আবিরের দিকে। তারপর মাথা রাখলো আবিরের বুকে।
_আমি আর কখনোই উচ্চবিলাসীতা করবো না। আমার যে তোমার এই বুকেই শান্তি। চাই না আমার দামী দামী শাড়ী-গয়না। শুধু তোমার ভালবাসা চাই। দিন শেষে তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই। কী দেবে তো আমায়?
আবির আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো নীলার সিঁথিতে। দুই হাতে আঁকড়ে ধরে রাখলো বুকের মধ্যিখানে।
_হুম। আমার সব ভালবাসা তোমায় দেব। দিন শেষে আমার বুকেও ঘুমাতে দেব। তুমি নিবে তো আমার ভালবাসা? “
পরম আবেশে নীলা মিশে গেলো আবিরের বুকের মাঝে। আদুরে গলায় বললো,
_হুঁ!”

গল্পের ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিলে খুশি হব।

——————-সমাপ্ত——————

Related Post

//ofgogoatan.com/afu.php?zoneid=3060777