খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

টুম্পা

“টুম্পা”


লেখাঃবিল্লাল হোসেন রুবেল

আমরা বই পড়লে দেখি,বইতে লেখা আকাশ নীল।আমার যেন মনে হয় আকাশ বহুরূপী। কখনও কালো,কখনো সাদা কখনো নীল,কখনো সাত রঙা রঙীন।

সত্যি আকাশ নীল।আর ওগুলো তার গহনা,অলংকার ভূষণ। এগুলো দ্বারা আকাশ বিভিন্ন রুপে সাজে।

এ আকাশ পানে তাকালে আমার দু’চক্ষু অশ্রু জলে সিক্ত হয়ে যায়।আকাশের লক্ষ কোটি তারকা রাজিরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়,আমার প্রাণের কথা,আমার ভালবাসার কথা,আমার স্নেহের কথা, সম্মানের কথা।

এই আকাশ পানে তাকিয়ে কথা বলতো আমার ছোট্ট বোনটি!যে কিনা আমাকে ছাড়া খেত না, ঘুমাতো না।যখনই আমি শুতে যেতাম, তখন আমার গা ঘেঁষে  শুয়ে ঘুমাতো।আর আজ আমাকে একা ঘুমাতে হয়।তাকে আর কাছে পাই না।তার মিষ্টি মিষ্টি কথার ছড়া গুলো শুনতে পাই না।আর এ না পাওয়া এখন আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে পিরা দেয়।

একদিন আকাশে ঘন কালো মেঘ করেছে।গুর,গুরুম শব্দ  আকাশের বুকে।কখনো কখনো বিজলী চমকায়,সারা বিশ্ব যেন আলোকিত হয়ে যায় মুহূর্তে। আবার তা বিলিন হয়ে অন্ধকার রুপ নেয়।তবে সময়টি ছিল বিকাল ৫ টা।আমার ছোট্ট বোনটি তখন ধীরে ধীরে এসে আমার পাশে বসলো।আমি তখন বসে বসে বাহিরের অবস্থা দেখছিলাম।আমার বোনটির নাম “টুম্পা”।
টুম্পা বললো,ভাইয়া তুমি বাহিরের দিকে তাকিয়ে কী দেখছো?
__কই?কিছুই তো দেখছি না।
__তবে শুধু তাকিয়ে রয়েছো?
__হ্যাঁ।
__ভাইয়া এই যে,উপর থেকে পানি পরে, তা মনে হয় কেউ ছিদ্র যুক্ত ঝাজুরি দিয়ে ফেলছে।
__আরে বোকা এ পানি আকাশ থেকে পরছে।
__ভাইয়া আকাশ কই?
__ঐ যে,উপরে যা দেখা যায়। ওইটার নামই আকাশ!
__কই কী দেখা যায়?আমি তো কিছুই দেখছি না।আর তা ছাড়া গত কালকে স্যার পড়িয়েছে যে, Sky is blue– অর্থ, আকাশ নীল।কিন্তু নীল তো কিছু দেখছিনা।
__যখন আকাশে মেঘ থাকবে না তখন আকাশকে নীল দেখায়।এখন আকাশে মেঘ জমেছে তাই এখন কালো কালো দেখাচ্ছে।
__তাহলে ভাইয়া মেঘ কি কালো?
__হ্যাঁ।
__ তাহলে মেঘ ইংরেজি কী ভাইয়া?
__মেঘ-cloud.
__তাহলে ভাইয়া আমি ইংরেজিতে বলি,cloud is-ওহ্ ভাইয়া,আমি তো কালো ইংরেজি জানিনা।বলো কালো ইংরেজি কী?
__কালো ইংরেজি – black.
__ও তাহলে,Cloud is black.
টুম্পা আমার সাথে কথা বলতে বলতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো আমি টুম্পাকে ওর স্থানে রেখে আসলাম।ভিষণ দমকা হওয়া বইতে শুরু করলো।চারদিকে বৃষ্টির পানিতে থৈ থৈ করছে,গাছগুলো এ দিক-ও দিকে ধুলছে।কখনো কখনো বিকট শব্দ করে আকাশ ডেকে উঠছে হঠাৎ এক শব্দে টুম্পার ঘুম ভেঙে গেল।তখন সে চোখ মেলে দেখে আমি তার কাছে নেই,তাই সে ওখান থেকে এসে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমার বোন টুম্পার হাসিতে কোন শব্দ হতো না।ছোট্ট করে মিষ্টি হাসি হাসতো।দেখতে ভিষণ ভাল লাগতো।আমি যখন স্কুল থেকে আসতাম,তখন সে দৌঁড়ে আমার কাছে আসতো।আমার শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে চকলেট বের করে সেই ছোট্ট মিষ্টি হাসি দিত।আর এই হাসিটুকু দেখার জন্য প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ওর জন্য চকলেন নিয়ে আসতাম।আর যদি চকলেট না আনতাম তাহলে এই মিষ্টি হাসিটুকু আর দেখতে পেতাম না।এখন এ হাসিখানা আমার মানসপটে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ হাসি আমাকে তার অভাবটাকে ইঙ্গিত করে,জাগিয়ে তোলে তার রেখে যাওয়া ভালবাসা।

যখনই আমি কোন কারণে কোথাও থেকে একটু বিলম্ব করে বাড়ি ফিরতাম তখনই সে দৌঁড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কোলে তোলার জন্য বায়না করতো।আমার আদর পেয়ে আমার বুকে মাথা রেখে শান্ত মনে নিরব থাকতো।মনে হতো যেন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন!

দু’দিন অতিবাহিত হলো,বৃষ্টি কমছে না মাঝে মাঝে ছোটখাট ঝড় হয়।এখন চারপাশে পানি থৈ থৈ করছে।তখন রাস্তাঘাট  পানির জন্য    কিছুই দেখা যাচ্ছে না  । কোথাও বের হওয়া যাচ্ছে না শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিয়েছি তিনটি দিন।আর আমার সঙ্গী ছিলো আমার ছোট্ট বোন টুম্পা।

আজ চতুর্থ দিন।হঠাৎ করে ভিষণ এক শব্দ এসে আঘাত হানলো টুম্পার ওপর!।টুম্পা ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।আমি তাকে আমার বুকের মাঝে চেপে ধরে অভয় দিলাম।এ শব্দে ও এমন ভয়ানক আঘাত পেল।যার ফলে ওর শরীর কাঁপিয়ে জ্বর উঠলো।তার জ্বর তখন আমার মনে ততোটা প্রবেদ দেয়নি।আম্মা আমাকে বললেন
__তুহিন,টুম্পার বোধহয় একটু ঠাণ্ডা লাগছে।ডাক্তারকে বলে একটু ঔষধ নিয়ে আয়।

রাতে টুম্পার জ্বর ভিষণ বেড়েছে।ঘুমের ঘোরে সে বললো,
__টুম্পাদি আমি তো, তোর নাত বউকে ভিষণ সুন্দর করে সাজাবো।আর আমার ভাইয়া দেখে  খুব খুশি হবে তাই… না।কই তুমি যে,কিছু বলছোনা?ঠিক আছে বাবা,কিচ্ছু না বল।

আমি টুম্পাকে ধরে কেঁদে দিলাম।তখন তার জন্য আমার ভিষণ মায়া হলো।সে এখন আর খেতে পারে না।দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে অতল গহীনে।এদিকে ভিষণ বর্ষনের কারণে কোন ভাল ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যেতে পারছিনা।যখন ভোর হলো তখন মা আমাকে বললো,
শহরে বড় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে।

আমি আর মা এক মাইল পথ হাঁটলাম টুম্পাকে কোলে নিয়ে।টুম্পা তখন অচেতন অবস্থায় আমার কোলে।ভিষণ হিমেল হাওয়া,চিরি চিরি বৃষ্টি, মা’র হাতে একটা ছাতা।শহরের রাস্তায় এসে একটা ভ্যান পেলাম।যখন টুম্পাকে নিয়ে ভ্যানে উঠলাম তখন টুম্পা চোখ খুললো।চোখ খুলে আমাকে বললো,”ভাইয়া”!
মা? আমি বললাম এইতো তোমার পাশে।টুম্পা বললো,”আমি মা’র কাছে যাব”।টুম্পা মা’র কোলে গিয়ে বললো,”মা আগামীকাল টুম্পাদীর বিয়ে।আমি আর ভাইয়া যাব না?তুমি গিয়ে টুম্পাদীকে বলে দিও।এ কথা বলে টুম্পা আর যেন কী বিড়বিড় করে বলে ঘুমিয়ে গেল।এ ঘুম আর ভাঙলো না।অনেক চেষ্টা করেও আর ভাঙাতে পারিনি।সে আমাদের রেখে চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে আমার তখন মনে হয়েছে পৃথিবীর সকল শান্তি,ভালবাসা,সুখ নিয়ে সে ঘুমিয়ে আছে।দুঃখ আর কষ্টগুলো দিয়ে গেছে আমাকে।তখন আমার চোখ দিয়ে একফোঁটা অশ্রএজল পরেনি।কেন যেন পরলোনা বলতে পারিনি।হঠাৎ আমি মাথা ঘুরে পরে যাই।তারপর কী হলো আর বলতে পারিনি।

“বর্ষণমুখর সেই দিনটি
কেড়ে নিয়েছে আমার প্রাণ!
কেড়ে নিয়েছে আমার হৃদয়!

টুম্পার সেই ছোট্ট হাতের কোমল পরশ এখন আর পাচ্ছি না।পাচ্ছি না শুনতে তার আদরমাখা ভালবাসার ভাইয়া ডাক!শুনতে পাচ্ছি না তার কৌতুহলী প্রশ্ন। যে প্রশ্নে জড়িয়ে থাকতো অনেক ভাবনা।এক নির্মম পরিনতি কেড়ে নিলো সেই আমার আদরের বোন টুম্পাকে।কেন এ নির্মম পরিহাস,
হে খোদা,তুমি বলে দাও কেমন করে বোনটির মায়া ভুলে থাকা যায়,কীভাবে তার স্পর্শ ভুলে থাকা যায়!এ কেমন করে সম্ভব! তোমার এ নিষ্ঠুর পরিনতির স্বীকার কেন করলে আমাকে?হে রহমানুর রহীম, তোমার রহমতের ভান্ডার থেকে একটু রহমও করতে পারতে না!

সমাপ্ত

Related Post

//stawhoph.com/afu.php?zoneid=3060777