খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

“পথের-বাঁকে”


লেখাঃ Khyrun Nesa Ripa

গ্রামের দুরন্তপনা স্বভাবের মেয়ে টুনি।গ্রামের মাটিতেই তার বেড়ে ওঠা।সারাদিন এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ।বড্ড অবাধ্য মেয়ে!কার গাছে পেয়ারা আছে, তো কার গাছে আম! এসব সারাদিন ঘুরে ঘুরে সঙ্গীদের সঙ্গে চুরি করাই তার দৈনিন্দনকার রুটিনে পরিনত হয়েছে।একটুও বাবা-মায়ের কথা শোনে না।সারাদিন টুনটুনির পাখির মত উড়ে বোড়ানোই তার স্বভাব।একবার এ ডাল তো আবার অন্য ডাল।বাবা-মায়ের লাগামহীন মেয়ে।মুক্ত আকাশে পাখির মত উড়ে বেড়াতেই তার আনন্দ। কয়েকদিন পরেই যে বয়স চৌদ্দ থেকে পঁনেরোতে পরবে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই তার।টুনির মা তো মেয়ের চিন্তায় অস্থির!! তার এই লাগামহীন মেয়েকে কে বউ করবে!!কত করে বোঝায় টুনিকে,”তবুও তাহার টনক নাহি নড়ে।”সে তার মতই করেই গ্রামের মেঁঠো পথ ধরে ঘুরে বেড়ায়।কিন্তু গ্রামের লোকজন এ বিষয়টা মোটেও ভাল চোখে দেখে না।এ নিয়ে কানা-ঘুষো চলতেই থাকে।তাতে কিচ্ছু যায় আসে না টুনির!!সে নিজের মতই স্বধীনভাবে মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়ায়।টুনির বাবার বড্ড আদরের মেয়ে টুনি।আর কোন ভাই-বোন নেই টুনির।তাই বাবার যত আদর সব একাই পায় সে।টুনির বাবার কোন অভিযোগ নেই মেয়েকে নিয়ে।কিন্তু টুনির মা, মেয়ের এই দুরন্তপনা মোটেও পছন্দ করেন না।তাতে টুনির কিছুই যায় আসে না।সে তার মায়ের এইসব রাগের ধার ধারে নাকি!মাঝে মাঝে টুনির মা ওর চুলের মুঠি ধরে আইচ্ছাতাড়া মাইর দেয়।তাতেও এই মেয়ে যেই সেই!!এইবার টুনি অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে।পড়াশুনাতেও অষ্টরম্ভা!! হবেই তো না পড়লে তো আর, এমনি এমনি ভাল ফলাফল আসবে না!!

টুনিদের গ্রামেই নিলয়দের বাড়ী।টুনিদের বাড়ী পেরিয়ে দুইটা বাড়ীর পরই নিলয়দের বাড়ি।ওর একটা ছোট্ট বোন আছে। এইবার ক্লাস পঞ্চম শ্রেনীতে উঠবে।আর নিলয় মাধ্যমিক দিয়ে সবে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে।খুব নিম্নবিত্ত পরিবার ওদের।তবুও কষ্ট করে দুই সন্তানের পড়ার খরচ চালিয়ে যান নিলয়ের বাবা।পেশায় নিলয়ের বাবা একজন কৃষক।তার দুইটা হালের গরু আর ভিটে বাড়ী ছাড়া স্থাবর- অস্থাবর আর কোন সম্পত্তি নেই তার।এদিক থেকে বেশ সচ্ছল পরিবার টুনিদের।টুনির বাবার গ্রামে একটা মুদির দোকান আছে।বেশ ভালই রোজগার হয় সেখান থেকে।আর তাই দিয়েই তাদের তিনজনের সংসার বেশ ভালই চলে যাচ্ছে।

নিলয় প্রতিদিনকার মত আজও সন্ধ্যের পর কুঁপি জ্বালিয়ে পড়তে বসছে।হঠাৎই টিনের চালে কড়মড় শব্দ হতেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসলো সে।বেশ জোড়েই বলল,,
“কে আছো চালে??শিঘ্রই নেমে আসো।”
আর তখনই টুনি ভয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো।টুনির কান্নার শব্দ শুনেই নিলয়ের বুঝতে বাকি রইলো না সে, কেনো এখানে এসেছে।নিলয়দের পিড়ার কোলেই একটা পেয়ারা গাছ আর বেশ বড় বড় পেয়ারা গাছে ঝুলছে।আর সে গুলি চুরি করার জন্যই টুনির এখানে আসা।আর শেষমেশ ধরা পরেও গেলো।
নিলয়ঃতুই পেয়ারা চুরি করতে এসেছিস কেনো??দাঁড়া তোর মারে আজকে এহনই বলমু।তুই এমন চোর কেন!
টুনি আরোও জোড়ে কেঁদে ফেললো,,
টুনিঃআমার ভুল হয়ে গেছে নিলয় ভাইয়া।তুমি আমার মারে এই কথা কইয়ো না, মায় তাইলে আবারও চুলের মুঠি ধইরা মারবো।
নিলয়ঃতবুও তো তোর লজ্জা নাই।সারাদিন দস্যিপনা কইরা বেড়াস।এত যে বড় হইচোস তাও তোর আক্কেল হয় না কেন?
টুনিঃআমার বড় ভুল হইয়া গেছে।আর এমন করুম না।তুমি মারে কিচ্ছু কইয়ো না।
নিলয়ঃকমু না মানে!?অহনি কাকিরে আমি সবটা যায়া জানামু।
টুনি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তাহলে আমিও চাল থেইক্যা নামুম না!।
নিলয়ঃআচ্ছা নাম।আমি কাকিরে কিচ্ছু কমু না।
টুনি কাঁপা কাঁপা পা নিয়ে নামতে গিয়েই পরে যাচ্ছিলো তখনই নিলয় ওকে ধরে ফেলল।
নিলয়ঃএখন তো তোরে পাইছি।আমি এহন কাকিরে কমু তুই আমাগো গাছের পেয়ারা চুরি করতে আইচোস।
টুনিও দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরলো নিলয়ের।

টুনিঃআচ্ছা কও।কে মানা করছে তোমারে!এহন আমিও সবাইরে ডাইক্কা কমু তুমি আমার ইজ্জত নেওনের লাইগ্যা আমারে কোলে তুইলা নিছো! বলেই খিলখিলিয়ে হাসছে।
টুনির কথা শুনে পুরাই আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলো নিলয়ের।ঝট করে কোল থেকে নামিয়ে, ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলো টুনির ফর্সা গালে।চড় খেয়ে টুনি গালে হাত দিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে বসে গেল।
নিলয়ঃচুপ।বেয়াদব মেয়ে।আবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে। আমি পরে যাওয়া থেকে বাঁচালাম উল্টো আমাকেই দুষছে।ঠাঁটিয়ে আরোও কয়েকটা চড় মারবো তোকে।রাত-বিরেতে চুরি কারতে আসছে।আবার বড় বড় কথা।আর যেন কখনো এই বাড়ীর ত্রি-সিমানায় তোকে না দেখি।
টুনি হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে কয়েক কদম সামনে এগুতেই পেছন ফিরে নিলয়ের দিকে তাকালো।জিহ্বা বের করে ভেংচি কেটে দৌঁড়ে চলে গেলো।নিলয় টুনির এমন ধারা কাজে না হেসে পারলো না।

বাড়ীতে এসেই টুনি পুকুরে ভাল করে হাত-পা ধুয়ে নিলো।কোমরে গুঁজে রাখা ওড়নাটা খুলে একটা ঝারা দিলো।তারপর ভাল মতো মাথায় পেঁচিয়ে ভদ্র মেয়ের মত ঘরে পা রাখলো।তখনি টুনির মা কর্কশ কণ্ঠ কানে ভেসে আসলো,,,
টুনির মাঃটুনি তুই কোথায় ছিলি??
টুনিঃওইত্তো রেহানাগো ঘরে(রেহানা প্রতিবেশি)
টুনির মাঃতোরে কতবার কইছি না রাতের পর বাইরে থাকবি না।সেই বিকালবেলা বের হইচোস আর হবায় ঘরে পা দিচোস।তুই বেতালে বাড়চোস টুনি।আমার একটা কথাও হোনচ (শুনচ)না।সারাদিন টাংটাং কইরা বেরাস।আমি তোর বাহেরে ডরাই না টুনি।যেদিন ধরমু চুল মাথায় একখানও রাহুম না।ভালা হইয়া যা কইছি।ভালা হইতে পইসা লাগে না।ভালা মায়াগোরে একবার কইলেই বোঝে।

টুনি মায়ের কথায় একটাও টু-শব্দও করলো না।আস্তে আস্তে পা ফেলে বাংলা বইটা হাতে নিয়া বিছানার উপর কাঁথা জড়িয়ে পড়তো বসলো।যখনই পেয়ারার কথা মনে পরলো তখনি স্যালোয়ারে গুঁজে রাখা পেয়ারাটা হাতে নিয়ে এক কামড় খাচ্ছে তো আবার একটু পড়তেছে।তখনি টুনির মা বলে উঠলো,,,
“টুনি তুই কী খাইতাচোস??”
টুনিঃকই!কিছুই তো না।
টুনির মাঃতোরে কইছি না মিচা কথা কওন ভালা না।
টুনিঃহায়ায় মা!!তুমি কী কও।কসম!!আমি কিছু খাই না।বিশ্বাস যাও তুমি!
টুনির মাঃকতবার তোরে কইছি মিচা কতা কইয়া কসম কাটতে না ।তাও তুই আমার কথা হোনচ না।আল্লাহয় পাপ দেয়, বোজস না ক্যান!!
কে শোনে কার কথা মায়ের কথার মাঝেই টুনি বেশ আয়েস করে পেয়ারা চিবুচ্ছে। আর মাঝে মাঝে জোড়ে জোড়ে পড়ার লাইন পড়ছে।

সেদিনকার পেয়ারা চুরির পর থেকেই টুনি নিলয়কে দেখলে, নিলয়ের ধারে কাছেও যায় না।উল্টো ভেংচি কেটে পালায়।কিন্তু নিলয় যে সেদিনই টুনিকে তার মনে স্থান দিয়ে ফেলেছে।সেটা কিছুতেই টুনিকে বলতে পারছে না।নিলয় ইচ্ছে করেই আজ গ্রামের মোড়ের পথে দাঁড়িয়ে আছে।কিছুক্ষণ পরেই টুনির স্কুল ছুটি দিব তাই।

টুনি বন্ধুদের সাথে কথা বলছে আর কথার মাঝখানে হেসে হেসে বন্ধুদের গায়ের মধ্যে ঢলে ঢলে পরছে।নিলয় দূর থেকে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।কী করে এই মেয়েটা এত দুষ্টুমি করে ভেবে পায়না নিলয়!!তারও তো নিজের একটা ছোট বোন আছে,সেও এত দুরন্তপনা করেনা। যা টুনি করে।টুনি কাছে আসতেই নিলয় টুনিকে ডাকলো,,
নিলয়ঃএই টুনি!এদিকে আয়?
টুনিঃউঁহু যামু না।তুমি আমারে ওইদিন মারছো মনে নাই??
নিলয়ঃআমার ভুল হয়ে গেছে।আর কখনো এমন হইবো না।
ধীর পায়ে টুনি নিলয়ের কাছে এসে বলল,,
টুনিঃকী কইবা কও?আমারে অহনই বাইত যাইতে হইবো।
নিলয়ঃকেমন আচোস তুই??
টুনিঃইশ ঢং!দেখলে গা জ্বলে।ওইদিন মাইরা এহন আবার দরদ দেহাতে আইছে।টুনি কেমন আছোস(ভেংচি কেটে বলল)
নিলয় টুনির কথায় হেসে ফেলল,
নিলয়ঃবললাম তো ভুল হইয়া গেছে।
টুনিঃহইছে আর তামাশা দেহাইয়ো না।এহন কী কইবার চাও, কইয়্যা হালাও।
নিলয়ঃটুনি তুই বউ হবি আমার!?
টুনিঃআহা গো আমারে পিরিত দেহাতে আইছে!!ওইদিন কী কইছিলা ভুইলা গেছো??কইছো না আমি যেন তোমাগো বাড়ীর ত্রিসীমানায় না যাই।এহন আবার এই কথা কেমনে কও??আমি তোমার বউ হইলে, তোমাগো বাড়ীতে যামু কেমনে??
নিলয়ঃওইটা তো রাগের মাথায় কইছি।এইডা মনে ধইরা রাখতে হয়??
টুনিঃআমি ওমনই।কেউ কিচ্ছু কইলে সহজে ভুলি না।
নিলয়ঃঅহন যা কইছি তার উত্তর দে।
টুনিঃআচ্ছা তুমি যেহেতু আমারে বউ বানাইতে চাও আমার কোন আপত্তি নাই। আমি তোমারই বউ হইমু।আমি আইজই মা রে কইমু আমি তোমার বউ হইতে চাই।
নিলয়ঃখবরদার না।তুই কাকিরে কিচ্ছু কবি না অহন।
টুনিঃতাইলে তোমার বউ হমু কেমনে??
নিলয়ঃহবি।যেদিন আমি তোরে বিয়া করুম সেদিনই আমি তোরে বউ কইরা আমাদের বাড়ী নিয়া যামু।
টুনিঃবউ হইলেই বুজি তোমাগো বাড়ীতে থাকতে পারুম?
নিলয়ঃহু।
টুনিঃবউ হয় কেন? তুমি জানো?
নিলয় হেসে ফেলল টুনির কথায়! কী আবোলতাবোল প্রশ্ন টুনির!!
নিলয়ঃআমারে ভালবাসবি তাই তুই আমার বউ হবি!!
টুনিঃভালবাসা আবার কেমন??বউ হইলে তো জানি শ্বশুর বাড়ী থাকতে হয়।ভালবাসলে আবার কী করতে হয়??
নিলয় বেশ জোড়ে হেসে ফেলল টুনির এসব কথায়।
নিলয়ঃআচ্ছা তোর অহন এসব বোঝন লাগবো না।তুই যহন আমার বউ হবি তহন আমি তোরে বুঝাইয়া দিমু।এহন বাইত যা।
টুনিঃহু।

এভাবেই নিলয় প্রতিনিয়ত তার ভালবাসা বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করে চলেছে টুনির কাছে।কিন্তু সহজ-সরল টুনি এই ভালবাসার কোন মানেই বুঝছে না।সে যে বুঝে খালি ওড়ার আনন্দ। নিলয়ের মনের ভালবাসা বোঝার মত সময় কোথায় তার??

হঠাৎ একদিন নিলয়ের বাবা তাড়াতাড়ি মাঠ ছেড়ে বাড়ীতে আসলেন।তার শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে।ভেবেছে সেরে যাবে তাই ইচ্ছে করেই চুপচাপ ছিলো।নিলয় কয়েকবার বলেছে গ্রামের ডাক্তারের কাছে যেতে কিন্তু নিলয়ের বাবা যায়নি।পরদিন সকালে হতেই বুঝতে পারলো নিলয়ের বাবার ডান হাত,ডান পা অকেজো হয়ে গেছে।কিছুতেই পা ফেলে হাটতে পারছে না।ডান হাত নাড়াতেই পারছে না।পুরো অবশ হয়ে গেছে।নিলয়ের মা চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন।কী করবে সে একা!নিলয়ও এখনো কোন কাজ করে না।কিভাবে চলবে তাদের সংসার।অবশেষে নিলয়দের দুইটা হালের গরু বিক্রি করে দেওয়া হয়।সেখান থেকে কিছু টাকা নিলয়কে দিয়ে নিলয়ের মা বলল,,

নিলয়ের মাঃজানি বাবা তোর খুব শখ ছিলো তুই পড়বি।কিন্তু এহন তোরে পরানোর মত ক্ষেমতা আমাদের নেই।বাবা তুই ঢাকা শহর চইলা যা।দেখ কোন কাম খুঁইজা পাস কিনা।
নিলয় ওর মায়ের কথার উপর আর কিছু বলতে পারলো না।কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুবই কষ্ট পাচ্ছিলো।অবশেষে রওয়ানা হলো ঢাকার শহর।চোখে অনেক স্বপ্ন বুকভরা কষ্ট নিয়ে পাড়ি জমালো স্বপ্নের শহরে।সেদিন যাওয়ার সময় টুনিকে বলে গিয়েছিলো,,
“টুনি তুই ভাল থাহিস।আমি ঢাকা থেকে ফিরেই তোরে আমার বউ কইরা আমার ঘরে নিয়া যামু।”
সেদিনও টুনি নিলয়ের অনুভূতি গুলো বুঝতে পারেনি।শুধু বোকার মত বলেছিল,”আইচ্ছা! “

প্রায় দু’মাস হয়ে গেলো নিলয় ঢাকাতে গেছে।টুনির কেনো যেন এখন নিলয়কে খুব মনে পরে।কিন্তু কেনো??সেটা বুঝতে পারে না।অন্যদিকে নিলয়েরও যে সারাক্ষণ পরাণ পুরতে থাকে তার টুনির জন্য!! তার টুনি কেমন আছে?তারে মনে করে কিনা আরও কত হাজারো কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়ত।

নিলয়ে ওদের  গ্রামের জহির চাচার ফ্লেক্সিলডের দোকানে ফোন করে ওর মায়ের সাথে কথা বলে।নিলয় একটা চাকরি পায়।দু’বেলা খাবার দিয়ে মাসে ছ’হাজার টাকা।এতেই নিলয় খুশি।নিজে দু’হাজর খরচ করে আর চার হাজার বাড়ীতে পাঠায়।যদিও এই টাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হয় নিলয়ের মায়ের তবুও টেনেটুনে চালিয়ে নেয়।নিলয় কয়েকবার ওর ছোট বোনের কাছে জিজ্ঞেস করে টুনির কথা।এভাবে কয়েকবার জিজ্ঞেস করায় একদিন ওর ছোট বোন বলল,
“ভাইয়া তুই টুনি আপুর কথা জিগাস কেন??ও তো আমাদের কেউ না।”
সেই থেকেই নিলয় আর বোনকে জিজ্ঞেস করে না টুনির কথা!!

একদিন টুনি স্কুল থেকে বাড়ীতে আসতেই দেখলো অনেক মেহমান।
টুনিঃমা এত মেহমান কেন আমাগো বাড়ীতে??
টুনির মা একগাল হেসে বলল,
“টুনি আজ তোর বিয়া।”
টুনিঃবিয়া মানে!!?আমি কাউরে বিয়া করুম না।আমি নিলয় ভাইয়ের বউ হইমু।ভাইয়া কইছে ঢাকার থেকে আয়া আমারে বিয়া কইরা ওর বউ বানাইয়া নিয়া যাইবো।
টুনির কথা শুনেই টুনির মা, টুনির মুখ চেঁপে ধরলেন,,
“খবরদার মুখপুরি এই কথা আর একবারও মোখ দিয়া উচ্চারন করবি না।আমি জানছি ভালা কথা আর কাউরে এই কথা কবি না।তুই তোর রুমে যায়া বয়।আমি আইতাছি তোরে শাড়ী পিন্দায়া দিমু।একটুবাদেই তোর বিয়া হইবো।
টুনিঃনা মা।আমি এই বিয়া করুম না।আমি নিলয় ভাইরে কথা দিছি।আমি ওনার বউ হমু।উনি কইছে ভালবাসা কেমন শিখাইবো।
টুনির মা আর কোন কথা কইতে দিলো না টুনিরে।টুনির রুমে নিয়া দরজা বন্ধ কইরা দিলো।টুনি অনেকবার মা’কে ডাকলো।কিন্তু টুনির মা দরজা খুলল না।অবশেষে টুনি অন্য কারো বউ হয়ে গেলো।যখন কবুল বলছিলো টুনি তখন নিলয়ের সেদিনকার সেই কথাটা মনে পরে গেলো টুনির,
” টুনি তুই আমার বউ হবি!”
কথাটা মনে পরতেই টুনির বুকের মধ্যে মোচড় দিয়া উঠলো।তবুও টুনি বুঝলো না কেন তার এমন লাগছে।টুনি ধরা ধরা গলায় “কবুল” বলল।কিন্তু কেন যে তার বুকের মধ্যে তখন এত কষ্ট লাগছিলো তার কিনারা করতে পারলো না টুনি!!!
বউ করে নিয়ে গেলো টুনিরে, পাশের গ্রামের মোসলেউদ্দিনের বিলত ফেরত ছেলে সালেম!!
কথা ছিলো টুনিরে মেট্রিক পাশ করাবে।কিন্তু বিয়ে হওয়ার সাথে সাথে সব কথা উল্টে গেলো।ছেলে ক্লাস সিক্স পর্যান্ত পড়ছে কিনা সন্দেহ।এখন তার বউ যদি এত উপরে উঠে যায় তাহলে, “তার মাথার উপর নুন থুইয়্যা বড়ি খাইবো।”আর পড়া হয়ে উঠলো না টুনির।তার মুক্ত আকাশে আর ডানা মেলো উড়া হলো না।বিয়ের সাথে সাথেই যে,তার ডানা দুটো কেটে দিলো সালেম।বন্দী করলো সংসার নামক  বন্দীখানায়।যেখানে প্রতিনিয়ত টুনি ছটফট করতে লাগলো। খাঁচার পাখি যখন বান্ধা পরে তখন বোঝে সে, কত কষ্ট!!আর টুনি সেটাই হারে হারে টের পাচ্ছে।তার ওই দুরন্তপনা স্বভাব শ্বশুর বাড়ীর কেউ পাত্তা দেয় না।মাঝে মাঝেই নিলয়ের কথা হুটহাট মনে পরে টুনির।কখনো কখনো নিলয়ের কথা মনে পরতেই চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু ঝরতে থাকে।

প্রায় নয় মাস হয়ে গেলো নিলয় টুনির কোন খোঁজই পাচ্ছে না।অবশেষে মালিকরে বলে ছুটি নিলো।গ্রামে আসবে সে!তার টুনিরে দেখবে।লাল টুকটুকে একটা শাড়ী কিনলো টুনির জন্য, এক পাতা কালো টিপ!লাল একটা লিপস্টিক। নিলয় ভাবতে লাগলো তার টুনিকে লাল শাড়ীতে কোমন লাগবে!!ভেবেই মনে মনে হেসে উঠলো আর যেন তর সইছে না নিলয়ের।কখন গ্রামে যাবে আর তার টুনির মুখখান দেখবে!!!লঞ্চে বসেই বসেই আকাশ-পাতাল ভাবছে নিলয়।এখন শুধু সকাল হওয়ার অপেক্ষা!!!

টুনি এখন অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে।বউ মানে কী!!ভালবাসা কী!!নিলয়ের প্রতি তার এত কিসের টান!!কেনো কষ্ট হয় নিলয়ের কথা মনে পরলে!!কেন দেখতে ইচ্ছে হয় নিলয়কে!!এখন সবটাই বুঝতে পারছে টুনি!কিন্তু এখন আর যে,কিচ্ছু হওয়ার নাই।সময়ের ব্যবধানে আজ সে নিলয়ের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে!!

নিলয় ফুরফুরে মেজাজে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেটে চলেছে।কাঁধে তার ঝুলছে একটা বড়সড় ব্যাগ।কী জানি! কী আছে ব্যাগে!! টুনি রোজকার মত আজও রাতের এঁটো বাসন-কোসন ধোঁয়ার জন্য ঘর ছেড়ে বের হলো।তখনি নজর গেলো পথের দিকে।টুনির হাত থেকে বাসনগুলো সব পরে গেলো।সে দৌঁড়ে চলে গেলো নিলয়ের সামনে।চোখজোড়া পানিতে টলমল করছে।টলমল চোখেই তাকিয়ে আছে নিলয়ের দিকে।ইচ্ছে করছে নিলয়কে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে!!জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, কোথায় ছিলে তুমি??একবারও তোমার এই টুনির কথা মনে পরলো না??কী করে এতদিন আমাকে ছেড়ে থাকলা তুমি!?কিন্তু… না।এমন কোন প্রশ্নই করতে পারলো না টুনি নিলয়কে।সব প্রশ্নগুলো এসে ভীর করে আছে কণ্ঠনালীতে!!কী করে করবে সে এমন ধারা প্রশ্ন, কে হয় সে নিলয়ের?সে তো এখন অন্য একজনের হয়ে গেছে!!চাইলে আর সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবে না।চোখদু’টোতে যেন ঝরনা হয়ে গেছে।কিছুতেই বাঁধ মানছে না তার!!নিলয় এতদিন পর প্রিয়তমাকে চোখের সামনে দেখে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না।নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ফেলল।কত প্রতিক্ষা করে ছিলো নিলয়!!তার টুনিকে দেখবে বলে,একটুখানি ছুঁয়ে দিবে বলে!তার ঘরনী করবে বলে!!
টুনি মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিলয়কে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো।
নিলয়ঃকেমন আছিস টুনি?
টুনি কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে জবাব দিলো,”ভালা”!
নিলয় এক মুহূর্ত টুনির পা-মাথা পর্যন্ত দেখলো।হাতে এক জোড়া কাসার বহু আগের পুরনো চুড়ি,গলায় একটা মতির মালা,নাকে একটা ইয়া বড় নোলক,আট পৌর করে পেঁচানো একটা পুরানো শাড়ী,মাথায় একটা বড়সড় ঘেমটা!!
নিলয় টুনির দুই বাহুতে হাত দিয়ে বলল,
নিলয়ঃটুনি তুই এরকম কেনো সেজেছিস??
টুনির বুকের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ থাকা ঝড়টা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।টুনির হৃদয়টাকে ভেঙ্গেচূড়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে।টুনি কিচ্ছু বলতে পারছে না শুধু কেঁদেই যাচ্ছে।
নিলয় ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
নিলয়ঃটুনি বল না??তুই এই ভাবে কেনো সেজেছিস??জানিস তোর জন্য আমি লাল টুকটুকে শাড়ী নিয়ে এসেছি।তোর তো লাল শাড়ী খুব পছন্দ তাই না??তোকে আমার বউ করে আমার ঘরে নিয়ে যামু।তুই তো ভালবাসা মানে বুঝিস না।তোকে সব শিখিয়ে দিমু।তবুও তুই কাঁদিস না।
টুনিঃবড্ড দেরি হয়ে গেছে নিলয় ভাইয়া!!আমি আর তোমার হইতো পারমু না গো।আমি অন্য কারো হইয়্যা গেছি।সে আমারে তার ইয়া মোটা শিকল দিয়া বাঁইধা রাখছে।চাইলেও আমি আর ওই শিকল ছিঁইড়া তোমার কাছে আইতে পারুম না।তুমি যে মেলা দেরি কইরা ফালাইছো!পারলে তুমি, তোমার টুনিরে ক্ষমা কইরা দিও!!কথাগুলো বলেই আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না টুনি।দৌঁড়ে সেখান থেকে চলে যেতে লাগলো।নিলয়ের কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিচে পরে গেলো!!সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।পুরো পৃথিবীটা যেন ঘুরছে।মনে হয় এক্ষনি আকাশটাও ভেঙ্গে তার মাথায় পরবে!!কিসের জন্য তার এত দূর ছুটে আসা!!কাকে দেখার জন্য এত মরিয়া হয়ে ওঠা!!কার জন্য লাল শাড়ী, কালো টিপ কিনে আনা!!চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেলো নিলয়ের।হাটু ভেঙ্গে বসে পরলো “পথের-বাকে”।টুনি দৌঁড়াচ্ছে আর মাথা থেকে ঘোমটাটা সরে গিয়ে চুলগুলোও বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে অবাধ্য হয়ে উড়ছে!!!এই তো তার সেই ছোট্ট টুনি দৌঁড়ে চলেছে!!পেছন থেকে চাতক পাখির মত  কান্না ভেজা চোখে নিলয় তাকিয়ে আছে তার দুড়ন্তপনা সেই টুনির দিকে!!আর টুনি…..সে তার গন্তব্যে দৌঁড়ে চলে যাচ্ছে।চিরদিনের জন্য তার ভালবাসাকে পেছনে ফেলে…..

কেমন লেগেছে জানাতে ভুলবেন না।আঞ্চলিক ভাষায় লিখা।

Related Post

//graizoah.com/afu.php?zoneid=3060777