খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

বৃদ্ধাশ্রম থেকে মায়ের চিঠি

স্নেহের বাবাই,

কেমন আছিস তুই? জানিস কতমাস তোর ওই মায়াবী বদনখানি দেখি না আমি। গ্রীষ্মের কাটফাঁটা রৌদ্রে তৃষ্ণার্ত কাক পানির পিপাসায় অস্থির হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে। শুধুমাত্র এক ফোঁটা পানির আশায়, তৃষ্ণা নিবারণ করতে। আমিও আজ সেই তৃষ্ণার্ত কাকের মতো! তোকে এক পলক আখি ভঞ্জন করে দেখার জন্য ভেতরটা সেই তৃষ্ণার্ত কাকের মতোই ছটফট করছে। আজ তোকে একটা গল্প বলতে খুব ইচ্ছে করছে। জানি তুই এসব গল্প শুনতে পছন্দ করিস না তোর অত টাইম কোথায়। তবুও আমি বলবো আজ। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের রাহুল মাস্টারের মেয়ে আমি। বাবার অতি সাধের মেয়ে রাহেলা। পাড়ার মোড়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতাম দূর থেকে লোকে বলতো রাহুল মাস্টারের মেয়ে একখান। মাশআল্লাহ রুপে-গুণে অাসাধারণ!  এক নামে ভদ্র-সভ্য বলে সবাই চিনতো আমায়। হঠাৎই একদিন তোর বাবার চোখে আটকা পড়লাম। তোর দাদার বাড়ি আমাদের পাশের এলাকাতেই ছিলো। আমাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো তোর বাবা। ঠিক কব্জা করে আমাকে আদায় করে ছাড়লো। বড় খেলোয়াড়  তোর বাবা নামক লোকটা! বিয়ের বছরখানেক ঘুরতেই হঠাৎ একদিন মাথা ঘুরে পরে গেলাম। তোর বাবা অস্থির হয়ে আমাকে হাসপিটালে ভর্তি করলো। কতবার বললাম, ‘কিছু হয়নি’। কে শোনে কার কথা। আমি যেন তোর বাবার কলিজার আধখান ছিলাম। এত ভালোবাসতে পারে কেউ কাউকে, সেটা তোর বাবাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। আমাকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিলো। রিপোর্টে আসলো আমি মা হবো। সবে দু’মাস চলছে। তোর বাবার সে কী পাগলামী হাসপাতালেই আমাকে কোলে তুলে…. যাচ্ছেতাই কাণ্ড। ধীরেধীরে তুই আমার ভেতর বেড়ে উঠতে লাগলি। একজন মেয়ের প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি আমি তোকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এ যে এক পরম প্রাপ্তি। কত যে ভালোবাসার তুই! দিন গুনতাম কবে তুই আসবি তোকে পিপাসা মিটিয়ে দেখবো। আস্তে আস্তে আমি মোটা হয়ে উঠছিলাম। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হতো খুব। হাত-পা ফুলে গেল অস্বাভাবিকভাবে। নুয়ে কোন কাজ করতে পারতাম না। পারলেও করতাম না পাছে তোর কষ্ট হয়। দু’পায়ের ব্যথায় রাতে এপাশ থেকে ওপাশে ফিরতে খুব কষ্ট হতো। যখন সাত মাস হলো এমন ভাবে লাথি মারতি প্রচুর ব্যথা পেতাম। তবুও আমি হাসতাম। কষ্টকে তখন কষ্ট মনে হতো না বরং আনন্দের ছিলো। পেটে আলতো করে তোর উপস্থিতি অনুভব করতে চাইতাম। তুই ভালো আছিস কিনা সেটা জানার জন্য নিয়ম করে চেকআপে যেতাম। জানিস কত রাত যে না ঘুমিয়ে কেটেছে সেটা শুধু আমার এই অন্তর জানে। কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজে একাকার। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতাম। তুই সুস্থ থাকবি তো! তোকে ভালোভাবে পৃথিবীর আলো দেখাতো পারবো তো! যদি নিজে মরে যাই তাহলে তোকে দেখবো কীভাবে, কীভাবে তোকে কোলে নেব, কীভাবে তোকে আদর করবো। কতশত অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনা চিন্তা! তোকে নিয়ে ভাবনার মাঝেও আমি আনন্দ খুঁজে পেতাম। রমজান মাস তখন,সন্ধ্যায় আমার ব্যথা উঠলো। সারারাত-সারাদিন প্রসব বেদনায় এক ফোঁটা ঘুম চোখে আনতে পারিনি। কখনো ঠোঁট কামড়ে সহ্য করেছি কখনো বা সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেলে চিৎকার করে কেঁদেছি। তবুও তোকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আনার লড়াই চালিয়ে গেছি প্রতিনিয়ত। পরেরদিন রাতে তুই পৃথিবীতে আসলি। যখন তোর কান্নার শব্দ আমার কানে আসলো বিশ্বাস কর আমি যেন সব কষ্ট ভুলে গেছি নিমিষেই। পাশ ফিরে তোকে একপলক কান্নাভেজা চোখে দেখেও নিয়েছিলাম সেদিন। আহা সে কী সুখের অনুভূতি! এরপর আস্তে আস্তে চোখজোড়া বুঝে গেল। জ্ঞাণ হারালাম আমি। জ্ঞাণ ফিরতেই তোকে কোলে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। তোর নানু তোকে আমার কোলে দিলেন। তোর ছোট্ট ছোট্ট হাত -পা, ছোট্ট মুখটা, লাল টকটকে ঠোঁটজোড়া, এইটুকুনি চোখ গুলো সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলাম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। অদ্ভুত অদ্ভুত অনুভূতিরা আমায় ঘিরে ধরলো। খুশিতে চোখের কোণে পানি চলে এলো আমার। আলতো করে তোর কপালে চুমু খেলাম। মুখে বললাম,’ বাবাই আমার!’ তোর তখন এক মাস বয়স। হঠাৎ একদিন আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজেকে দেখে নিজেই আঁৎকে উঠলাম। এটা কী সেই আমি? রাহেলা! নিজের মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করলাম। সেই সুন্দর গড়নের রাহেলা নই আমি। সমস্তটা পাল্টে গেছে আমার। ঘাড়ের নিচে কালসেটে পরে গেছে। চোখের নীচে গভীরতা, পুরো মুখ ভর্তি ছোপ ছোপ কালো দাগ। এলোমেলো মাথার চুল। জট পেকে একটার সাথে অন্যটা লেগে আছে। গায়ের রঙটাও বিবর্ণ হয়ে গেল। আগের সেই মোলায়েম হাতটাও খসখসে! মুহূর্তেই একরাশ মন খারাপ আমাকে ঘিরে ধরলো। সহসাই তোর কান্নার আওয়াজ কানে বাঝলো। মুখে আমার তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো তোকে কোলে নিলাম। সহস্র চুমুতে তোকে ভড়িয়ে দিলাম।  নিজের সেই সৌন্দর্যরুপকে তুচ্ছ করে তোকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। তোকে নিয়ম করে খাওয়ানো। তোর ন্যাপী পাল্টানো। তোকে গোসল করিয়ে দেওয়া। মাঝে মাঝে এত এত বমি করতি নিজের তো সব ভিজাতি সাথে আমারটাও। একটুও রাগ হতো না। বরং তোর বমি করা দেখে কান্না করে ফেলতাম। খুব হয় হতো আমার! তোকে হারিয়ে ফেলার ভয়!  কারণ তুই যে ছিলি আর একটা ছোট্ট পৃথিবী! যে পৃথিবী ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন! তবে সব কিছুর মাঝে তোর বাবার থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিলাম। তোকে সময় দিতে গিয়ে তোর বাবাকে একদম সময় দিতে পারতাম না। মানুষটা চোখের সামনে দিন দিন কেমন বদলে যেতে লাগলো। একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখলাম উনি ওনার চাহিদা মেটানোর জন্য অন্য মেয়েদের সাথে ভিডিওতে….থাক এসব আর নাই বা বললাম। বড্ড রুচিতে লাগে আমার এসব বলতে। সেদিন কষ্টে তোর ওই ছোট্ট বুকে আমার মাথা রাখলাম। চোখের জলে আমার ওড়না ভিজে একাকার। সেদিন তোকে সাক্ষী করে মন খুলে কাঁদলাম যাতে তুই বড় হলে আমাকে বুঝিস। কিন্তু দেখ সে গুঁড়েবালি! হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম তোর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। রাগে, অভিমানে, কষ্টে তোর বাবাকে আর নিজের মুখ দেখাবো না বলে বাবার বাড়ি চলে গেলাম। সবাই আরও উল্টো রাগারাগি। ছেলেরা এমন কয়েকটা বিয়ে করতেই পারে। মেয়েদের এত কিসের দেমাগ। মেয়েরা হলো দাসী। কাজ করবে, সন্তানাদি পালবে আর খাবে। সব ব্যাপারে তাদের এত চুলকানি কিসের। জানিস নিজের আত্মীয়দের এমন ব্যবহারে সেদিন আমি কাঁদতেও ভুলে গেলাম। কিন্তু আমার ভেতরটা ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছিলো সেদিন। সেই রাতেই তোকে নিয়ে পালিয়ে এলাম ঢাকার শহর। যাকে সবাই এক নামে চেনে। কত নাম এই শহরের। টাকার শহর, স্বপ্নপূরণের শহর আরও কত কী! আমিও স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে তোকে নিয়ে পাড়ি জমালাম। তোকে একটা স্কুলে ভর্তি করলাম। নিজে একটা গার্মেন্টসে চাকরি নিলাম। তোকে একটা ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য, ভালো খাওয়ানোর জন্য রিতিমতো যুদ্ধ করতে লাগলাম। মাঝে মাঝে মন সায় দিলেও শরীরটা সায় দিতে চাইতো না। আর কতই বা সায় দিবে! তবুও ঘুরে দাঁড়ালাম শুধু তোকে ভালো রাখার জন্য। কত শকুনে যে চিঁড়ে খেতে চেয়েছিল। সবার সাথে লড়াই করলাম শুধু আমার পৃথিবীটাকে আঁকড়ে বাঁচতে। একটু সুখের নিঃশ্বাস ফেলতে। তোকে মানুষ করার জন্য। কত স্বপ্ন আমার। সবই পূরণ হলো। তুই একজন নামকরা হার্ট সার্জেণ্ট। এরপরের গল্প তো সবই তোর জানা। কী আর বলবো। গল্প খুব লম্বা হয়ে গেল রাগিস না কেমন। এই শোন আমার দাদু আর দিদিভাই কেমন আছে? জানাতে ভুলিস না। বউ মাকে নিয়ে আর আমার দাদু আর দিদিভাইকে নিয়ে খুব ভালো থাকিস। ওহ্ শোন না আর একটা কথা। যখনই তোর কথা খুব মনে পরে তখনই বুকের বা’পাশে খুব যন্ত্রণা হয় আমার। সেই যন্ত্রণা আমার ভেতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। বিশ্বাস কর সেই ব্যথা সহ্য করা আমার জন্য ছোটখাটো একটা লড়াই! আমাকে একটু পরীক্ষা করে দেখবি? তুই তো নামকরা হার্ট সার্জেন্ট। আমার হার্টের রোগটা কী যদি একটু জানতে পারতাম! ভালো থাকিস, বাবাই আমার!

বৃদ্ধাশ্রম থেকে
জন্মদাত্রী

Related Post

//ofgogoatan.com/afu.php?zoneid=3060777