খাইরুন নেছা রিপা

গল্প প্রেমী

×

সারপ্রাইজ

সারপ্রাইজ

একজনকে খুব ভালবাসতাম আমি।সে ও আমাকে আমার থেকে কোন অংশে কম ভালবাসতো না।বরংচ আমার থেকে বেশিই ভালবাসতো সে আমাকে।কিন্তু আমাদের কারোর পরিবারই আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছিলো না।তাই দু’জনেই পালিয়ে গেলাম।ছোট্ট একটা সুখের সংসার পাতলাম।ভালবাসায় পূর্ণ ছিলো আমাদের ছোট্ট সংসারটা।উনি খুব ভালবাসতেন আমাকে।কিন্তু ওনার কিছু কিছু ব্যাপারগুলো আমার মোটেও ভাল লাগতো না।উনি কখনো কোন স্পেশাল ডেগুলোতে আমাকে কোন সারপ্রাইজ দিতেন না।আমি খুব করে চাইতাম উনি আমাকে উইশটুকু অন্তত করুক, তাও না।ভেলেন্টাইন ডে,এনিভার্সেরি ইভেন কোন ঈদ উপলক্ষেও আমাকে সারপ্রাইজ গিফট তো দূরের কথা, মুখে একটু উইশ পর্যন্ত করতো না।তাই আমিও ওনাকে উইশ করতাম না।কেমন যেন আগ বাড়িয়ে এসব করতে মন সায় দিত না।তবুও ওনার ম্যাসেঞ্জারে ছোট্ট করে একটা টেক্সট করে রাখতাম।হয়তো সেটা ওনার চোখেও পরতো না।আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর হতে চললো।কখনো এনিভার্সেরিতেও উনি আমাকে উইশ করেনি।আধোও মনে হয়  এনিভার্সেরির কথা মনে থাকতো না ওনার।আমার সবচেয়ে বেশি এনিভার্সেরির দিনগুলিতে খুব মন খারাপ হত।এত কষ্টের পর আমরা দুজন একত্র হয়েছি, তাও উনি কী করে এই দিনটার কথা ভুলে যেত!?কী জানি হয়তো মনে থাকতো,কিন্তু মুখে প্রকাশ করতো না।তখন মন খারাপ করলেও পরে আবার ঠিক হয়ে যেতাম।একবার উনি আমার জন্য একটা পায়েল কিনে নিয়ে এসেছিলেন।পায়েলটা যেদিন এনে ছিলেন সেদিন উনি নিজে হাতে আমাকে পায়েলটা পড়িয়ে দিয়েছিলেন।কেনো যেন সেদিন ব্যাপারটা আমার কাছে একটু আধিক্ষেতাই মনে হয়েছিলো।যে যেসবে অভ্যস্ত নয় সেগুলো করলে কেমন যেন হজম হয় না।আমারও সেদিন এমনটাই হয়েছিলো।ও আপনাদের তো আমার নামটাই বলতে ভুলে গেছি। আমি রিপা।আর আমার উনি হলেন রোহান।আমাকে ভালবেসে রিপু বলে ডাকতো।কখনো আপনি,কখনো তুমি আবার কখনো তুই বলতেও তার জুড়ি ছিলো না।যখন যেটা ভাল লাগতো সেটাই ডাকতো।তবে তার যখন খুব অভিমান হত,তখন আমাকে আপনি করেই ডাকতো।দুষ্টু-মিষ্টি ঝগড়া,একটু রাগ -অভিমান নিয়েই আমাদের ছিলো ছোট্ট সোনার সংসার।সারাক্ষণ রিপু রিপু বলে ডাকতে ডাকতে আমার মাথা খারাপ করে দিত।রিপু আমার শার্টটা কোথায় রেখেছো?রিপু আমার প্যান্টটা পাচ্ছি না,আমার ল্যাপটপটা কোথায় রাখলে আর মডেমটাই বা কোথায় রেখেছো?।এইভাবে সারাক্ষণই সে আমাকে নিজের কাছে ডাকতো।
রোহানঃরিপু আমার শার্টটা আয়রন করে দাও না।
আমিঃপারবো না।আপনি করে নিন।(আপনাদের তো বলাই হয়নি, আমি আমার ওনাকে সবসময় আপনি বলেই ডাকতাম)
রোহানঃআমার লক্ষ্মী বউ না তুমি?প্লিজ একটু আয়রন করে দাও।
আমিঃউঁহু…আমি লক্ষ্মী না।
রোহানঃআচ্ছা তোকে দশ টাকা দেব।এবার তো আয়রনটা করে দে।
আমিঃআমার দশ টাকা লাগবে না।নিজেরটা নিজে করুন।
রোহানঃআচ্ছা অনেকগুলো আদর করে দিব।তাহলে হবে?
আমিঃদরকার নাই আমার আদরের।
রোহানঃআচ্ছা কাউকে করতে হবে না।আমি আজ এই শার্ট পরবোই না।(মন খারাপ করে বলতো)
তখন একদাফ বকর বকর করে শার্রটা আয়রন করে দিতাম।তখনই আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতো।আমিও নিজেকে ছাড়ানোর জন্য জোড় জবরদস্তি করতাম।
আমিঃআমাকে কষ্ট দিয়ে এখন ঢং দেখাতে আসছে।
রোহানঃএত রাগ করলে হয়?বলেই আমাকে আদরে ভরিয়ে দিত।
আমি দাঁতমুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে  ওনার আদরটা উপভোগ করতাম।ভাল লাগতো না এমন কিন্তু নয়,শুধু সেটা মুখে প্রকাশ করতাম না।

সারাক্ষণ শুধু যেন তার পৃথিবীতে আমিই বিচরণ করতাম।তার পৃথিবীতে যেন আমিই একজন মানবী ছিলাম।যাকে ঘিরেই তার ছোট্ট পৃথিবীতে সে শ্বাস ভরে নিঃশ্বাস  নিতে পারতো।
এমনই চলছিলো আমাদের দাম্পত্য জীবন।
সেদিন আমাদের পঞ্চম এনিভার্সেরি ছিলো। আমি বিরস মুখে বসে বসে টিভি দেখছি।জানি আজও সে আমাকে উইশ করবে না।হয়তো তার মনেই নেই।টিভির দিকে তাকয়িে আছি ঠিকই কিন্তু মনটা খুব খারাপ আমার।তখনি ফোনটা বেজে উঠলো।তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে থেকে ফোনটা তুলতেই দেখলাম উনি ফোন করেছেন।
আমিঃহ্যালো।
রোহানঃএকটু সাজুগুজু করো তো!
আমি ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলাম,”কেনো”?
কারন উনি কখনোই সাজগোজ পছন্দ করেন না।আমাদের বিয়ের এই পাঁচ বছরে এমন একদিনও উনি আমাকে বলেননি যে,তোমাকে এই শাড়ীতে ভাল্লাগছে বা তুমি আজ একটু সাজুগুজু করো।কখনোই বলেননি।এমনকি আমিও তেমন সাজতে পছন্দ করি না।
রোহানঃসারপ্রাইজ আছে।
আমার খুশিতে মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো।ভাবতে লাগলাম কী সারপ্রাইজ দেবে আমাকে!!তখনই ওনার কথায় আমার ভাবনায় ছেদ পরলো ।
রোহানঃআমি এখনি অফিস থেকে বের হয়েছি।তুমি তাড়াতাড়ি সেজেগুজে রেডি হও।আমি আসছি।আর হ্যাঁ…..অফ হোয়াইট কালারের শাড়ীটা পড়ো কিন্তু!!কথাগুলো বলেই উনি ফোনটা রেখে দিলেন।
ফোনটা ড্রেসিংটেবিলের ওপর রাখলাম।ওয়াশরুমে ঢুকে হাত-মুখটা ভাল করে ধূয়ে নিলাম।শাড়ীটা পরলাম।অফ হোয়াইট কালারের ভেতর কালো কাজ।শাড়ীর পাড়টা কালো লেচের।ওনার কালো,সাদা,ফিরোজা সব হালকা কালারগুলো খুব পছন্দের। আর আমি ওনার সম্পূর্ণ বিপরীত।আমার সবসময় ব্রাইট কালার খুব ভাল লাগে।তবে ওনার সাথে আমার একটা কালারের ম্যাচিং আছে।আর সেটা হলো ফিরোজা।আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ এই কালারটা।কিন্তু আমি শ্যামলা হওয়ায় ফিরোজা কালারে আমাকে তেমন সুন্দর লাগে না।

অফ হোয়াইট কালার শাড়ীটার সাথে মাখন জর্জেটের থ্রি-কোয়াটার হাতার ব্লাউজ পরলাম।চুলগুলো মাথার ওপর একটু ফুলিয়ে কাকড়া বেন্ড দিয়ে রেখেছি।আর কোমর সমান চুলগুলো খোলা রেখেছি পুরো পিঠ জুড়ে।চোখের ওপর একটু আইলেনার দিয়েছি।কাজল দেব কী দেব না ভাবছি।কারন কাজল পড়লে আমাকে ভূতের মত দেখতে লাগে।তাই আমি তেমন একটা কাজল পড়ি না।তবুও চিকন করে একটু দিলাম।আমার চোখগুলো ছোট থেকেই খুব বড়।আর বড় চোখে কাজল পড়লে নাকি সুন্দর লাগে।কিন্তু আমার কাছে আমাকে কখনোই কাজল পরলে ভাল লাগেনি।ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক দিলাম।আমার বরাবরই লাল লিপস্টিক খুব অপছন্দের আর ওনারও।যদিও মাঝে মাঝে কখনো কোন অনুষ্ঠানে গেলে একটু লাল লিপস্টিক পড়া হয়।ভাবছি কপালে একটা টিপ পড়বো।পরক্ষনেই ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখলাম।আমি টিপ পড়তে অনেক ভালবাসতাম।যখন ক্লাস এইটে ছিলাম।আমার কপাল থেকে টিপ উঠাতামই না।তবে সেটা শুধু কালো টিপ।সারাক্ষণ কপালেই থাকতো। গোসল করার সময় পরে যেত।আবার নতুন করে পরতাম।এইভাবে নাইনেও চলছিলো একদিন উচ্চতর গনিত প্রাইভেটে গেছিলাম।তখন আমার টিচার কিন্তু  আমাদের ব্যাচের সবাই ওনাকে ভাইয়াই ডাকতাম।উনি সেদিন বলেছিলো,”রিপা টিপ দিও না।টিপ দেওয়া ভাল না।”মনটা খারাপ হয়ে গেছিলো সেদিন।প্রাইভেটেই মাথাটা নিচু করে টিপটা খুলে ফেলে দিয়েছিলাম।তারপরও মাঝে মাঝে টিপ পড়তাম।পুরোনো অভ্যাস তো আর সহজে মুছে ফেলা যায় না।একসময় সফল হলাম।তারপর থেকেই টিপ পড়া বাদ।আর কখনো পড়া হয়নি।এই হলো আমার টিপের কাহিনি।

সাজুগুজু শেষে নিজেকে ঘুরেঘুরে দেখছি।না অতও খারাপ লাগছে না।শ্যামলা আমি তাতে কী!!তাই বলে কী অত বাজে নাকি দেখতে!তবে…..হ্যাঁ আমার উনি একদম ফর্সা ছিলেন।আমার থেকেও খুব সুন্দর ছিলেন উনি।মাঝে মাঝেই ওনাকে প্রশ্ন করতাম,,”আচ্ছা আপনি আমাকে কেন পছন্দ করলেন??আমি তো আপনার মত সুন্দর না।উনি উত্তর না দিয়ে শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরতেন তার বুকের মাঝে।সেদিন এসব ভাবতে ভাবতেই মুখে হাসি ফুটে উঠেছিলো আমার।বসে বসে অপেক্ষা করছিলাম আমি।সে কখন আসবে আর আমাকে সারপ্রাইজ দেবে!!!রাত প্রায় অনেক হয়ে গেলো তবুও উনি আসছেন না।তখনি ফোনটা বেজে উঠলো।দেখলাম ওনার নাম্বার।রিসিভ করেই অভিমানের স্বরে বললাম,,এত লেট হচ্ছে কেনো আপনার??সেই কখন থেকে আপনার জন্য ওয়েট করছি!!”
তখনি একটা অপরিচিত কণ্ঠ কানে ভেসে আসলো,”কে আপনি?”
আমিঃআপনি কে??আর আপনার কাছে এই ফোন আসলো কিভাবে?এটা তো আমার হাজবেন্ডের?
অপরিচিতঃআমি একজন পথযাত্রী।এই ফোনটা যার উনি এখন হসপিটালে।বড় লড়ির সাথে ওনার বাইকের সংঘর্ষ হয়।ওনার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরকারি হসপিটালে চলে আসুন।
আর  কিচ্ছু শুনতে পারলাম না।ফোনটা হাত থেকে পরে গিয়েছিলো সেদিন।চোখদুটো দিয়ে যেন ঝরানা বয়ে যাচ্ছিলো।দৌঁড়ে একাই ছুটে গেলাম হসপিটালে।ততক্ষণে সে আমার ধরা ছোঁয়ার অনেক দূরে চলে গেছে।যেখানে যাওয়ার পর কেউ আর কখনো ফিরে আসেনা।ওনার বেডের পাশে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল,আর একটা রেপিং কাগজে মোড়ানো সারপ্রাইজ গিফট বক্স দেখেছিলাম।সবাই বলাবলি করছিলো, শুনলাম,”ফুল আর গিফট বক্সটা ওনারই!!”

হ্যাঁ…. চলে গেছে।তার জীবনের বিনিময়ে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়ে চলে গেছে।কিন্তু আমি তো কখনো ওনার কাছে এমন সারপ্রাইজ চাইনি।দরকার ছিলো না আমার সারপ্রাইজের।আমার ওনাকেই প্রয়োজন ছিলো!কিন্তু না সে আর ফিরবে না।আর কখনো তার মধুমাখা কণ্ঠে “রিপু” বলে ডাকবে না আমায়।আজও আমাদের এনিভার্সেরি!তবে সেটা পঞ্চম না দশম!আজও সেই রেপিং কাগজে মোড়ানো গিফট বক্সটা ওভাবেই রেখে দিয়েছি।খুলে দেখার মত কেন যেন সাহস পাইনি।প্রতিবার এনিভার্সেরির দিনে  গিফট বক্সটা হাতে নেই,নেড়েচেড়ে আবারও আলমারিতে তুলে রাখি।কেন যেন সাহসে কুলোয় না, কী আছে দেখতে ওই রেপিং কাগজে মোড়ানো বক্সে!!আমার তো কোন গিফট চাই না শুধু আমার ওনাকে চাই!!!কিন্তু জানি সে আর কখনো ফিরবে না………বউ বলে ডাকবে না আমায়। আর বলবে না, রিপু আমার শার্টটা আয়রন করে দাও না, লক্ষ্মী বউ আমার!!

                       সমাপ্ত

————খাইরুন নেছা রিপা———-

Related Post

//luvaihoo.com/afu.php?zoneid=3060777